মোহাম্মদ ইকবাল: করোনাকালে অনেক ছবি এঁকেছি

জুবায়েদ দ্বীপ
Published : 30 June 2016, 06:38 AM
Updated : 21 April 2022, 02:50 AM


আসলে করোনা তো বৈশ্বিক একটা ব্যাপার। সারা বিশ্বব্যাপী যে অবস্থা তৈরী হয়েছে, তাতে মানুষের জীবনযাত্রা সব বদলে গেছে। এটা বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। নেতিবাচকভাবেই বলবো যে এটা সর্বক্ষেত্রেই, তা একজন পেশাজীবিই হোক বা চাকরিজীবি যে শ্রেণিপেশারই হোক, সার্বিকভাবে প্রতিটা মানুষকেই প্রভাবিত করেছে।
এই করোনাকালে আমার মূল জিনিসটা ছিল যেটা, তাহলো খুব সচেতনতা রক্ষা করা। সচেতনভাবে চলাফেরা করা। যেহেতু ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতার একটা কাজ আমার আছে, সেখানেও কিছু দায়িত্ব আমার রয়েছে। করোনা আসায় যেসব ক্লাসে আমাদের সিলেবাস সম্পূর্ণ করা হয় নাই, সেগুলি আমরা অনলাইনেই ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা করেছি।
আর পাশাপাশি যেহেতু আমি ছবি আকার মধ্যে সবসময়েই আছি, আমার অবসরে, আমার চাকরির দ্বায়িত্ব পালনের পরে বা ছুটির দিনে আমি সবসময়েই ছবি আঁকার মধ্যেই থাকতাম। এটা আমার সাধারন নিয়ম। কিন্তু করোনা যখন শুরু হলো তখন থেকেইতো সার্বিকভাবে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেলো। করোনার শুরু থেকেই আমি বাইরে বের হই নাই, তখন আমার নিজস্ব যে স্টুডিও আছে, বাসা আর স্টুডিও পাশাপাশি আলাদা বিল্ডিং এ, সেখানে এসে পড়তাম। লকডাউন হোক আর যাই হোক, স্টুডিওতে এসে আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওখানেই সময় কাটিয়েছি। যেহেতু স্টুডিওতেই ছিলাম, নিয়মিত ছবি এঁকেছি। এই ছবি আঁকার মধ্যেই আমার করোনার সময়টা পার হয়েছে।

করোনার মধ্যে আমি নিজের থেকেই মানুষকে যতটুকু পারি সহযোগিতা করার চেষ্ট্যা করেছি। করোনাকালে দুস্থ মানুষদের সহায়তা করার জন্য এজ ফাউন্ডেশন একটা ফান্ড তৈরী করে, আমাদেরকে তারা বললো পেইন্টিং ডোনেট করেন। তারা বললো যে পেন্টিং সম্পূর্ণই ডোনেট করতে হবে, যেইটা বিক্রি হবে, তার বিক্রির পুরা টাকাটা ফান্ডে চলে যাবে। আমি নিজে দিলাম, আমার ওয়াইফের কাজও দিলাম। সিলেক্টিভ কিছু আর্টিস্ট নিয়ে এই এক্সিবিশনটা, ওরা অনলাইনে অকশন করলো এবং ছবিগুলি বিক্রি হলো। এরকম আরও কিছু জায়গায় দিলাম। চারুকলার যেসব শিক্ষ্যার্থীরা অর্থনৈতিক সংকটে আছে, তাদের কয়েকজনকেও বাছাই করে পেন্টিং ডোনেটের টাকা থেকে সাহায্য করেছি।


আর এমনি আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সারারক্ষণ তো আর ছবি আঁকিনা, কখনো একটু নিউজ দেখি, কখনো ছবি আঁকি, এভাবেই আমার সময় কাটে। ২০২০ এর মার্চে আমার একটি একক এক্সিবিশন ছিল জাপানের কোবে শহরে। আমার টিকেট পর্যন্ত কাটা হয়ে গেছিল, যেহেতু মার্চেই আমাদের দেশে করোনা ধরা পরে, এবং পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাওয়া শুরু করলো, আমি যেতে পারলাম না জাপানে, বাংলাদেশ থেকে কুরিয়ারে পেইন্টিং পাঠিয়ে দিলাম। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আমি জাপানে যাই। জাপানে হোটেলে বসে আমি কিছু ছোট ছোট কাগজের মধ্যে বিভিন্নভাবে ছবি আঁকি। এগুলি পরবর্তিকালে আমি আমার ফল এক্সিবিশনেও যুক্ত করে দেই।

তারপর জাপান থেকে ফিরে এসে আমি ছবি কন্টিনিউ আঁকছি, স্টুডিওতে আমার বড় বড় ছবি হচ্ছে। আবার গত বছর এপ্রিলে গেলাম দুবাইয়ের আর্ট ফেয়ারে। ওখানে দুর্জয় ফাউন্ডেশন আমাদেরকে ইনভাইট করে নিয়ে গেছিলো। এছাড়া দেশের মধ্যে গ্যালারি কায়ার একটা আর্ট ক্যাম্প হলো সিলেটের লালা খালে, ঐখানে ৩ দিনের জন্য গিয়েছিলাম।

এছাড়া মাঝেমাঝে ভার্সিটি্তে যদি মিটিং থাকে তাহলে সেখানে যাই অথবা অনলাইনেই মিটিং করি। এভাবেই আমার সময়টা গিয়েছে আসলে।

যারা ক্রিয়েটিভ সাইডে আছে, সৃজনশীলতাতো আমাদের একটা প্রাকটিক্যাল ওয়ার্ক, তাই না! যারা অফিস করে বা কাজ কর্মের মধ্যে থাকে, কাজকর্ম বন্ধ থাকলে তাদের আর কিছু করার নাই। পরিস্থিতি এমন যে কারর কিছু করার নাই, সারাক্ষণই ঘরের মধ্যে থাকতে হয়, ঘরে থেকে তো কিছু করার নাই তেমন, হয় টিভি দেখে, নাইলে নিউজ পড়ে, নাহলে ঘুমায়, এইভাবেই সময়টা কাটায়। আমি এই করোনাকালে অনেক ছবি এঁকেছি। প্রচুর ছবি এঁকেছি। এবং সময় কাটছে আমার স্টুডিওতে, আমার এসিস্টেন্ট আছে একজন, সে ও আমি বাসায় ঘুম থেকে উঠে ব্রেক ফাস্ট করেই স্টুডিওতে চলে আসি। ছেলেটা আমাকে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে দেয়, কফি খাই, তারপর ছবি আঁকাআঁকি করি, তারপরে দুপুরে লাঞ্চ করে একটু রেস্ট নিয়ে আবারও ছবি আঁকা।


এছাড়াও টুকটাক সাংসারিক কিছু কাজ কর্ম থাকে যেগুলিতে না গেলেই না। আমার বাচ্চা আছে দুইটা। আমার ওয়াইফ সচরাচর বের হয়না, সেও আর্টিস্ট এবং তার আলাদা স্টুডিও আছে, সেখানে অবসর সময়ে ছবি আঁকে।
এইভাবে সন্ধ্যা থেকে ১১-১২টা পর্যন্তও ছবি আঁকি। এই করোনার মধ্যেও অনেকেই আমার স্টুডিও ভিজিট করছে। যদিও ওইভাবে না, যথেষ্ট্ দূরত্ব বজায় রেখেই করে। আসলে একা একা আর কত থাকা যায়? মাঝেমাঝে আমার দু একজন বন্ধু বান্ধবকে ইনভাইট করছি, এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কিছুক্ষণ আড্ডা দিছি।
এই সময়টা আমি উপভোগ করছি, নিজে সুস্থ থেকে, নিজে কাজের মধ্যে থেকে, আমি একটা সুন্দর সময় পার করছি।
এই মহামারি ঐভাবে সরাসরি আমার শিল্পভাবনাকে প্রভাবিত করেনি। এমনিতে আমি যে ধরনের বিষয়বস্তুর ছবি আঁকি তারমধ্যে সার্বিকভাবে এসব বিষয় এমনিই আছে। আমার ছবিতে অনেকসময় আমি বাচ্চাদের বা মেয়েদের মুখের ছবি আঁকি, এগুলি আসলে বর্তমান সময়েরই প্রতিচ্ছবি। মহামারী বা দুর্যোগ বা যুদ্ধ, সমস্ত কিছুই-সমাজের এত সমস্যা- এগুলি মানুষের তৈরী, যেমন পরিবেশ বিপর্যয় যা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, বন্যা, এগুলি সব মানুষের কারণেই আসছে। আমরা শিক্ষায়, বিজ্ঞানে অনেক পরিবর্তন আনছি, অনেক চিন্তা ভাবনা করছি কিন্তু পৃথিবীকে আমরাই ধ্বংস করছি, যেমনি বিজ্ঞান আধুনিক হচ্ছে, তেমনি বিজ্ঞানই পৃথিবিকে ধ্বংস করছে। যুদ্ধে যত মারনাস্ত্র, মানুষের বিরুদ্ধে যত অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে সব মানুষের সৃষ্টি। এখনও পর্যন্ত যুদ্ধতো থেমে নাই, যুদ্ধ চলছেই, মানুষকে মানুষ হত্যা করছে। এবং পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।


এই বিপর্যয় আমার ছবিতে, এইযে বাচ্চাদের বা মুখের যে একটা এক্সপ্রেশান, আমি যে মুখগুলো আঁকি, এটার মধ্যেই একটা অভিব্যক্তি, একটা বাণী, একটা ল্যাঙ্গুয়েজ ক্রিয়েট করি, যা একটা ভাষার মতো, দর্শকের চোখের মধ্যে ঐ অভিব্যক্তিটা ফুটে ওঠে।
আমার কাজে, আমি চোখগুলিকে খুব গুরুত্ব দেই, চোখের মধ্যে একটা ইমোশন থাকে, চোখের একটা ভাষা থাকে, সেটাই আমি বাচ্চাদের মধ্যে বা মেয়েদের মধ্যে তুলে ধরি। আজকের জনবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবটা আগামি প্রজন্মের শিশুদের উপরে পড়বে। যে অবস্থা তৈরি হচ্ছে তাতে প্রভাবটা পরবর্তি জেনারেশনের বাচ্চাদের উপরেই পড়বে। এগুলিই আমার ছবিতে আছে। এবং করোনা যেহেতু একটা বিপর্যয়, তাই আমার ছবিগুলো বিষয়ভিত্তিকভাবে বর্তমান অবস্থার সাথে সম্পর্কিত।
করোনার কারনে মারা গেল কত মুখ, যারা হয়তো এই মহামারীটা না থাকলেই বেঁচে থাকতো, পরিচিত প্রচুর মুখ করোনার কারণে চলে গেছে। তো এরকম পরিস্থিত মনোবল শক্ত রাখতে নয়, নিজে সুস্থ্ থাকতে হয়। সেভাবেই আছি।
শ্রুতিলিখন: জুবায়েদ দ্বীপ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক