ফ্রানজ কাফকা: লেখক যখন ‎‎চিত্রশিল্পী

বিপাশা চক্রবর্তীবিপাশা চক্রবর্তী
Published : 12 Oct 2021, 11:29 AM
Updated : 12 Oct 2021, 11:29 AM


অজানা শিল্পীর আঁকা কাফকার প্রতিকৃতি

বিশ্বসাহিত্যে বিশ শতকের প্রধান পুরোহিত ফ্রান্জ কাফকা যার মন্ত্রোপম রচনায় সমকাল এমনি পরবর্তী বহু লেখক মুগ্ধ ও প্রভাবিত হয়েছেন। এক অর্থে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ছিল তারই একচ্ছত্র প্রতাপ। এটা বলাও অতুক্তি হবে না যে তিনি একুশ শতকেরও প্রধান লেখক। কিন্তু বর্ণমালার এই অধিপতি যে রেখা ও রংয়ের সফল অনুশীলন করেছিলেন তা আমাদের কাছে অনেকটাই অজানা। শিল্পের এই মাধ্যমে তার অনুশীলন বা চর্চায় ছিল লক্ষণীয় রকমের দক্ষতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে, কাফকা তাঁর ছবি আঁকার প্রতিভা আবিষ্কার করেছিলেন।

দিবাস্বপ্নে বিভোর তরুণ ফ্রানজ, তার বাবার দোকান দেখাশোনার দায়িত্ব নেবে না। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর, বাবা-মা একমাত্র সম্ভাব্য সমাধানে পৌঁছলেন: সে পছন্দ করুক না করুক, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, নিজেকে একজন পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলবে।
কাফকার বাবা মা ছেলের জীবিকা নির্বাহের জন্য এমন একটি পেশাকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছিলেন যা সম্মানজনক, একইসাথে লাভজনক। এদিকে সে নিজের জন্য এমন ভবিষ্যতের কল্পনা করে রেখেছিলেন যেটা তাঁর ভেতরের সৃষ্টিশীল সত্তাকে একটি পরিচয় দিবে। কাফকা পরিবারের কুলপতি বাবা হারমান তাঁর ছেলের চোখে একজন অবিসংবাদিত স্বৈরশাসকের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলেন না। একবাক্যেই তিনি ছেলে কী বিষয়ে পড়াশোনা করবে তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, আঠারো বছর বয়সী একজন তরুণ তখনো পরিবার প্রদত্ত ভাতার উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। কেবলমাত্র তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তার বাঁধার কারণে প্রাগ সমাজের জন্য স্বাভাবিক আর গ্রহণযোগ্যা হয়ে উঠতে পারছিলেন না।

যুবক কাফকার ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহই যথেষ্ট ছিল এটা নিশ্চিত হবার জন্য যে তিনি রসায়ন বিভাগে যা খুঁজছিলেন তা খুঁজে পাবেন না। তিনি প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে নাম লেখালেন। প্রথমে এই বিভাগকে ক্রুদ্ধভাবে সমালোচনা করলেও, চাকরি পাবার প্রতিশ্রুতি থাকার দরুন এটি তাঁর কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। কেননা প্রাথমিকভাবে এটিই তাকে ভবিষ্যতের পেশাগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কয়েক বছর বিলম্ব করার সুযোগ করে দেয়।

যেমনটি প্রত্যাশিত ছিল, ছাত্র কাফকা 'রোমান আইন' অধ্যয়নে নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিতে অস্বীকার করেন। ( কাফকা তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পর্কে এমনটিই উল্লেখ করেছিলেন) । উপরন্তু তিনি শিল্পকলা, স্থাপত্য ও দর্শনের কোর্সে নাম লেখান। এটি প্রাথমিক পর্যায় ছিল, তিনি তখনও নিজেকে লেখক হিসেবে আবিষ্কার করেননি। তাঁর দুটি শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা- ভিজ্যুয়াল আর্ট এবং সাহিত্য, মনে হচ্ছিল যেন প্রথমটি জয়ী হতে পারে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন তাঁর ছবি আঁকার প্রতিভা নিষ্ফল নয়। তাঁর সব নোটবুকের মার্জিনগুলি ডুডল এঁকে ভরে ফেলতে শুরু করলেন।


চিত্রকর্ম: শিল্পীএমিল অর্লিক-এর আঁকা 'জাপানী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে উইলো গাছের নিচে, ১৯০১'
তিন খন্ডে কাফকার জীবনী রচিয়তা রাইনার স্ট্যাচ ধারণা দেন যে, ছাত্র জীবনে আঁকা প্রথমদিককার স্কেচগুলি তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে উপস্থাপন করে। তাঁর ভবিষ্যতের সাহিত্যিক সৃজনশীলতাকে দানা বাঁধতে তখন পর্যন্ত সেটা প্রারম্ভিক কিন্তু বড় ধরণের পদক্ষেপ। চিত্রকলাপ্রেমী কাফকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরগুলিতে এমিল অর্লিক নামে একজন আঁকিয়ের "জাপানিস" শিরোনামের শিল্পকর্মে ভীষনভাবে বিমোহিত হয়েছিলেন। অস্ট্রিয়ান ইহুদি ঐ আর্টিস্ট জাপানে পোড়াশোনা করেছিলেন।

রঙ তুলির একক রেখায় অরলিক ভূদৃশ্য এবং মানুষ দুটিই নৈপুণ্যের সাথে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতেন। মিনিমালিস্ট চিত্রকলার সমতলতা তরুণ কাফকাকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল। আপাতদৃষ্টে এর সরল নান্দনিক রূপটি তিনি আঁকার জন্য নির্বাচিত করেছিলেন। এটিই হয়তো ভবিষ্যতের লেখকের মাঝে দানবীয় সৃজনীশক্তি বহন করে এনেছিল।


কাফকার সম্পত্তির নথিপত্রের মধ্যে কাফকার স্কেচে ভরা একটি কালো নোটবুক আছে। নোটবুকের শেষে 'দ্য জার্নি- আই নো নট' / The Journey—I Know Not শিরোনামে একটি লেখার খন্ডাংশ আছে। "তাই মেয়েটি ঘুমায়, আমি তাকে জাগিয়ে তুলি না" এই শব্দগুলো দিয়ে খন্ডিত লেখাটি শুরু হয়। কাফকার বন্ধু ম্যাক্স ব্রড নোটবুকের সাথে সংযুক্ত একটি পৃথক পৃষ্ঠা চিহ্নিত করেছিলেন, যা স্পষ্টতই ১৯২০ সালে রচিত হয়েছিল। কাফকা ১৯২৪ সালে মারা যান। কারণ এর উপরে হিব্রু শব্দ 'স্না'ইট' (কাঠবিড়ালী) দেখা যায়। এবং আমরা জানি যে কাফকা ১৯১৭ সালে হিব্রু ভাষা শিখতে শুরু করেছিলেন।


কাফকা কেন ছবি আঁকা ছেড়ে সাহিত্য বেছে নিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরটির সংকেত সম্ভবত তাঁর বন্ধু গুস্তাভ জানুখ'কে বলা কিছু কথার মধ্যে আছে। যা 'কনভার্সসেশন উইথ কাফকা ( ডেরেক ভার্সকোয়েল লিমিটেড, ১৯৫৩)' বইটিতে উদ্ধৃত আছে। কাফকা বলেছিলেন " আমার ভালো ছবি আঁকতে পারা উচিত। সত্যি বলতে কি, আমি সবসময় চেষ্টা করেছি। কিন্তু তা থেকে কিছুই বেরিয়ে আসেনি। আমার আঁকাগুলি একান্তই ব্যক্তিগত ছবি লেখা, যার অর্থ এমনকি একটা সময় পরেও আমি আবিষ্কার করতে পারিনি"।

বিদেশি নিবন্ধ অবলম্বনে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক