মান্নান-এর বিশ্বাস

আবদুস সেলিম
Published : 31 Oct 2010, 06:06 PM
Updated : 31 Oct 2010, 06:06 PM


আবদুল মান্নান সৈয়দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে
————————–

জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করব না, কারণ সে যোগ্যতা আমার নেই। তবে মান্নানকে আমি দীর্ঘ ৪১ বছর থেকে দেখেছি এবং বেশ ঘনিষ্ঠ ভাবেই। এর চেয়েও দীর্ঘ পরিচয় মান্নানের সাথে অনেকের হয়তো ছিলো কিন্তু নিরবছিন্ন বন্ধুতার দাবী আমিই বোধ হয় করতে পারি। ১৯৬৯ সালে প্রথম পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। এরপর থেকেই মান্নানকে কাছে ও দূর থেকে দেখেছি।

একজন লেখককে দেখা ও চেনা যায় দু'ভাবে। এ উপলব্ধি আবদুল মান্নান সৈয়দকে প্রত্যক্ষ করে আমার এসেছে-শুধুমাত্র তাঁর লেখা দিয়ে; ব্যক্তিগত, জীবনের সাথে সম্পৃক্ত থেকে-অর্থাৎ তাঁর সাহচর্য্ পেয়ে এবং ঐ জীবনকে এবং বিশ্বাসকে তাঁর লেখার সাথে মিলিয়ে নিয়ে।

মান্নান লেখেন ১৯৫৯ থেকে–কিংবা তারও আগে থেকে। আমি তাঁকে পেয়েছি ১৯৬৯ এ। অর্থাৎ দীর্ঘ ১০ বছর পর। এর পর থেকে তাঁর ব্যক্তি জীবনের যে স্তর গুলো আমি লক্ষ্য করেছি তা তাঁর লেখার সাথে সহজেই মিলে যায়।

"ছোটবেলা থেকে আমি স্বভাবে ছিলাম নির্জন, আত্মকেন্দ্রী, অ-মিশুক ও চূড়ান্তরকম অ-সামাজিক।" মান্নান তাই ছিলেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মান্নানকে হুবহু ঐ ভাবেই দেখা গেছে। সিলেটে ও তার আগে পর্যন্ত তাঁর ঘরে বসে-মান্নান যা লিখেছেন তা অতীব নির্জন। 'জন্মান্ধ' কবিতা বা 'জ্যোৎস্না রৌদ্র'–আপাদমস্তক আত্মবৃত। কিন্তু সিলেটের ঘরে বসে একটা প্রস্তুতি চলছিলো। ১৯৬৮-৬৯ সালে বিশ্ব কবিতার সাথে তাঁর কথোপকথনের ফল "মাতাল মানচিত্র"। দুয়ার কিছুটা যে ফাঁক হয়েছিলো তার প্রমাণ, মান্নান আমাকে ঠিক ঐ সময় কালেই একটা ছোট্ট আসন দিয়েছিলেন তাঁর কাছাকাছি বসতে।

আমি আরো একটু উদাহরণ দিই–ঐ সময়কাল পর্যন্ত লেখা মান্নানের গল্প বই আকারে বেরিয়েছে ৬৮ সালে "সত্যের মত বদমাশ" নাম নিয়ে। আমি ৬৯-এর আগ পর্যন্ত মান্নানকে ঐ বইয়ের মাধ্যমেই চিনতাম। নিরপেক্ষভাবে অপরিচিত মান্নানের ঐ বই পড়ে আমার মনে হয়েছিলো–লেখক এক অন্য জগতের। আমি আগেই বলেছি দুভাবে একজন লেখককে চেনা যায়। বন্ধুত্বের পর মিলিয়ে নিয়েছি ব্যক্তি মান্নান ও শিল্পী মান্নানকে।

১৯৭০ থেকে ৭৫ পর্যন্ত মান্নান এক অবস্থান্তরের ভেতর দিয়ে যান। সিলেট থেকে ঢাকায়। ৬৮-৬৯ এর "মাতাল মানচিত্র" তাঁকে যে উপলব্ধি এনে দেয়–আমি দেখেছি তার কিছু অনিবার্যতা। মান্নানের পরিচিতির বলয় বাড়তে-বাড়তে এতো বড়ো হয় যে আমি যে তখন পর্যন্ত একমাত্র সহচর ছিলাম – কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। মান্নানের এই বেরিয়ে পড়ার অস্থিরতা তাঁর নিজের ঘরের হারানো চাবি খোঁজার মতো। তখন সত্যিই মান্নান চাবি খুঁজতে ব্যস্ত ছিলেন এবং হেন জায়গা নেই যেখানে সেই চাবির সন্ধানে তিনি যান নি।

চাবি'র খোঁজে যে "অন্ধ দৌড়" এবং তারপর যেখানে এলেন মান্নান সে সম্মন্ধে তাঁর ধারণা, "এখন এই মধ্যরাতে আমি কোথায় যে চলে এসেছি। কার টানে! কেন এলাম! কোথায় এলাম!" মান্নান ঠিকই বলেছেন তাঁর "আমার বিশ্বাস" গ্রন্থে যে, "চাবি" গল্পে যে ধারার প্রবর্তন তিনি করেছিলেন তারই পরবর্তি ফল 'চলো যাই পরোক্ষে' এবং ঐ আত্ম-পরিচয়ের চাবি খোঁজা যে তাঁকে বিব্রত করেছে তা নিঃসন্দেহে (প্রসঙ্গত ৭১-এর যুদ্ধ, 'বাংলাদেশ ১৯৭৪' কবিতা তার একটি প্রমাণ ও দেশ স্বাধীনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিও মান্নানকে আবর্তিত করেছে)। ১৯৭৬ কি ৭৭-এর দিকে আবার মান্নানকে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। ইতিমধ্যে মান্নান সংসারি হয়ে কিছুটা স্থিত। আসলে মান্নান তো 'আশৈশর বিমর্ষ, গম্ভীর স্বল্পবাক, লাজুক ও আত্মবৃত'-বাইরের জগৎ যে উত্তাল ও বিলোড়ক ছিলো তার উপলব্ধি পরিপূর্ণ হলো এর পর এবং মান্নান তাই তাঁর অর্গল খুলে সময়ে বেরিয়ে পড়েন, সময়ে সে অর্গল বন্ধ করেন। তাই আজীবন তিনি অসামাজিক।

………….
নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ, ২০০৬
………….

'আমার বিশ্বাস'-এ মান্নান লিখেছেন তাঁর প্রিয় কবিরা হলো-নেরুদা, লোরকা, ট্রাকল, কীটস। নেরুদা সম্মন্ধে আমাদের দু'জনেরই পাগলামি ছিলো। মনে আছে আমাদের দু'জনের সম্পাদনায় প্রকাশিত "শিল্পকলা" পত্রিকায় ১৯৭২-এ মান্নানেরই প্রেরণায় বাংলা ছন্দ জ্ঞানহীন আমি শুধুমাত্র অনুভূতির জোরে কিছু কবিতা অনুবাদ করে ছেপেছিলাম। কিন্তু আরও আশ্চর্য ঘটনা অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্যে। সেই অদ্ভূত 'মেমোয়া', নেরুদার বইটি আমিই আনিয়েছিলাম বন্ধুকে দিয়ে ১৯৭৭-এ। হাত থেকে প্রায় কেড়েই নিয়েছিলেম মান্নান। তারপর উধাও প্রায় একমাস। আমিও পড়িনি বইটা তখনও। বহুকষ্টে একমাস পরে যখন দেখা তখনও মান্নান কাঁপছেন এতো আলোড়িত হতে এর আগে কখনও দেখি নি মান্নানকে, যদিও পাগলামী দেখেছি গান নিয়ে, ছবি আঁকা নিয়ে। এরপর মান্নান বৈচিত্রময় জীবনে আগ্রহী হয়ে উঠলেন দারুণ, নেরুদার বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতা তাঁকে এক নতুন জগতে ঠেলে দিলো। এর ফল হলো ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে কলকাতা যাওয়া। এই কলকাতা ভ্রমণ আর এক বৈচিত্র আনলো মান্নানের জীবনে ও লেখায়। 'অ-তে অজগর' নভেলাতে মান্নান nostalgia-তে ভূগেছেন, জয়েসের Potrait-এর নায়ক Stephen Dedolous যেমন ঘুরেফিরে জন্মভূমি ছেড়ে আসার আত্ম-অপরাধে ভোগে মান্নানও তেমনি অজগরের শরীরের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে 'জন্মের মতো নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যাবা'র স্মৃতিকে এই নভেলায় বর্ণনা করেন। কলকাতায় এলাম আমরা। মান্নান উচ্ছ্বসিত, উম্মাদ প্রায়। অথচ এই কলকাতা যাবার ব্যাপারে আমি ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৭২-এ মোটেও মান্নানকে উদ্ধুদ্ধ করতে না পেরে ওঁকে বাদ দিয়েই গেছিলাম। তখনও মান্নানের অন্তর্গত মানুষটা বাইরের সবকিছু গ্রহণে প্রস্তুত ছিলো না।

কলকাতা যেয়ে মান্নান যত উচ্ছ্বসিত ছিলেন আমি পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে ছিলাম না, সেখানকাপর লেখক বই-পত্র, সিনেমা যানবাহন, জীবিকা, মানুষ এবং মেয়ে–সব ব্যাপারে দারুণ কৌতুহল। আমি তো কবি নই। তাই মান্নানের ভেতরে কি ঘটেছে টের পেলাম পরে। দেশে ফিরে পরিকল্পনা চললো 'কলকাতা' উপন্যাসের। আলাপ করলো আমার সাথে এই উপন্যাসের খসড়া নিয়ে, অন্তহীন! তখন এক নতুন উপলব্ধি এলো মান্নান ও আমারাও। জন্মভূমির টান ভেতরে-ভেতরে যতই তীব্র থাক যে মাটিতে বেড়ে উঠেছেন, যার রস আস্বাদন করে পরিপূর্ণ হয়েছেন, যার জল-বায়ু স্পর্শ করেছে মান্নানকে, তাকে অস্বীকার করা যায় না। তাই কলকাতা উপন্যাসে মান্নানের আকুলতা, 'এই বিশাল মহানগরের অন্ধকারের ভেতরে আমার সেই কালো ব্যাগটা খুঁজে পাবো তো আবার? তার ভেতরের সব-কিছু থাকবে তো ঠিকঠাক?' কবিতা ক্ষেত্রে সৃষ্টি হলো, 'পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি'। আর প্রবন্ধে, জীবননন্দের উপর সীমাহীন অনুসন্ধান। কোথায় যাইনি আমরা–অশোকানন্দের নির্বিকার অনভ্যর্থিত বাসা থেকে আনন্দবাজার বা Statesman এর পুরোনো সংরক্ষিত তুলোট কাগজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ন্যাশনাল লাইব্রেরি! এসবই পরে মান্নান বিভিন্নভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

মান্নানের প্রথম জীবনের লেখা এমন ছিলো কেন? এই পর্যায়ে তাঁর চিন্তা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং সর্বোপরি তাঁর ভাষা দারুণ নির্জন ছিলো। তাঁর সাথে পাঠকের সংশ্লেষ কঠিন-এমন এক চূড়ায় এই সংশ্লেষ সম্ভব যেখানে পৌঁছুতে প্রায় পাঠকেরই ক্লান্তি আসে, বিরক্তি আসে। মান্নানের বন্ধু হয়ে আমাকে কম বিড়ম্বিত হতে হয়নি। মনে আছে, শিল্পকলা পত্রিকা বের করার সময় বিজ্ঞাপন জোগাড় করার ভার ছিলো আমার, কারণ মান্নান তখন তো 'ট্রেঞ্চ খুঁড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আত্মবিবরে'। মানুষের সাথে কথাই বলতে পারতেন না, আর বিজ্ঞাপন চাওয়া! অথচ পরবর্তিতে 'চারিত্র' বলে যে পত্রিকা আমরা দুজন বের করছি তার মূল বিজ্ঞাপন সংগ্রাহক কিন্তু মান্নান। যাই হোক ঐ সময় স্বভাবতই আমি আরও তরুণ, উদ্দীপ্ত ছিলাম। কিন্তু অনেকেই বিজ্ঞাপন দিতে চাননি মান্নানের নাম শুনে। কারণ তিনি যা লেখেন তা নাকি কবিতা নয়। তর্ক করেছি, দুঃখ পেয়েছি, ভেবেছি অনেক সময়–আমিই ভুল। একবার কোন কারণে করাচির এক হোটেলের লনে এক পাঠকের সাথে এক পশলা তর্ক করলাম মান্নানের জন্মান্ধ কবিতা গুচ্ছের 'জ্যোৎস্না' কবিতা নিয়ে কিংবা 'সত্যের মতো বদমাশ' নিয়ে। অবশ্য আমি ভেবে দেখেছি, এই পাঠকরা একজন লেখকের একটি বা দু'টি কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস পড়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, যেমন তাঁরা করেন রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের দু'একটি লেখা পড়ে এবং নির্দ্বিধায় বলেন, "রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল তো বুঝি আপনার মান্নানকে তো বুঝিনা ভাই!" মান্নান বলতেন, 'আমার বিশ্বাস' 'জন্মান্ধ কবিতা গুচ্ছ'-এর কবিতাগুলি আমার আঠারো-ঊনিশ বছর বয়সের লেখা…'খটখাট মাটির ভিতর ঊনিশ বছর আমি ছিপ ফেলে বসে আছি আত্মার সন্ধানে'। এই আত্মার সন্ধানই তো চাবিকথা। 'সব কবিকেই ব্যক্তিগত তমসা থেকে নিষ্ক্রমিত হতে হয় ব্যক্তিগত সূর্যের উদ্দেশ্যে'। মাত্র ১৮/১৯ বছরের তরুণ নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত সূর্যের সন্ধান পেয়ে যায় না। তবুও ঐ প্রচেষ্টাকে তো ফেলে দেয়া যায় না। কারণ মান্নান বলছেন 'আমি প্রথম থেকেই ছিলাম অন্তর্মূখী শিল্পী। সুররিয়ালিজম সম্পর্কে তখন কিছুই জানতাম না; সেজন্য বিশুদ্ধ সুররিয়ালিস্ট কবিতা ঐ বইয়েই আছে বলে আমি মনে করি।…আমার এখনো বিশ্বাস, এই অপরিমার্জিত কবিতাই প্রকৃত কবিতা।' এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলতে চাই আমি-'শিল্পে সচলতা শুধু সম্ভব অনুশীলনে। সহানুভূতি ভালবাসা ও সযত্ন অনুশীলনের মধ্য দিয়েই বুঝে ওঠা যায় পরবর্তিদের। কিংবা এই পরিবর্তমান জীবনে বোধ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা, কৌতুহল, জিজ্ঞাসা ও অধ্যয়ন ক্রমাগতই পরিবর্তমান, প্রসরমান এবং অগ্রসরমান।'

এভাবে মান্নান বারবার যে অনুশীলন ও অগ্রসরমানবতার কথা বলেছেন তাঁর লেখায়, বইয়ে এবং তাঁর সাথে আমি বিশ্বাসে মনে-প্রাণে একমত। অসন্তোষ যদি শিল্পের মূলে কাজ করে তবে একমাত্র অনুশীলনই একজন শিল্পীকে অগ্রসরমান করে। আমি মানতে রাজী নই দীর্ঘ নিরবতা কোন মহৎ ও সত্য শিল্প সৃষ্টির সহায়ক, বরং তার ঘাতক। শিল্পের ক্রম-উদ্ঘাটনই শিল্পীকে নিজ ক্ষমতা ও সর্বোপরি আপন সম্মন্ধে একটা উপলব্ধি এনে দিতে পারে। যা বিশ্বাস করি তা কতটা উদ্ঘাটিত হয়েছে তা জানা এবং প্রয়োজন বোধে বিবর্তন ও পরিবর্তন শিল্পীর জন্যে পূর্বশর্ত। মান্নান তো ঠিকই বলেছেন, আমার রচনা একটি গাছের মতো। আমি ঘনিষ্টতার সূত্রে বলছি, যদিও মান্নান 'ধারাবাহিকভাবে অবিরল' কোনো একটি সাহিত্য মাধ্যম অনুশীলন করেননি, তবুও সবসময়ই কোনো না কোনো মাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

আবার আমি মান্নানের দুর্বোধ্যতায় ফিরতে চাই। একটা মানুষের সাথে সারা জীবন কাটিয়েও তাকে সম্পূর্ণ চেনা যায় না-এমন কথা প্রায়ই শুনি আমরা। 'ইস্কুলের উঁচু ক্লাসে উঠে আমার প্রিয় পাঠ্য এবং অবসর বিনোদনের উপায় ছিলো অভিধান পাঠ'-এ কথা আমি জানলাম 'আমার বিশ্বাস' পড়ে এবং ঠিক-ঠিক মিলে গেল। মান্নানকে খুব কমই অভিধান ঘাঁটতে দেখেছি বানান শুদ্ধ করতে। এছাড়া ঐটুকু পড়েই বুঝে গেলাম যে ছেলের, 'গোধুলির আলোয় যতোক্ষণ দেখা যেতো ততোক্ষণ চোখ আটকে থাকতো অভিধানের শব্দপুঞ্জে। এই ভাবে বাংলা ভাষার সংখ্যাহীন শব্দের সঙ্গে আমার পরিচয়, প্রণয়, এমন কি পরিণয়ও বলা যেতে পারে, ঘটে যায়।', সে ছেলের পক্ষে যে কোনো শব্দ স্বতঃস্ফুর্তভাবে তার লেখায় ব্যবহার অসম্ভব নয় এবং ফলে সে দুর্বোধ্য হয়ে গ্যাছে অনেকের কাছে– প্রথমত নির্জনতার কারণে, দ্বিতীয়ত ভাষার কারণে। কিন্তু নিঃসন্দেহে মান্নানের বিবর্তন হয়েছে এবং ব্যক্তিজীবনে তার ব্যাখ্যা আমি আগেই দিয়েছি। বিবর্তন আমৃত্যু হয়েছে-'একসময় ধারণা ছিলো আমার শিল্পের কাজ হচ্ছে পূর্ণতার দিকে অভিসার, শিল্পী মানেই পূর্ণতাপন্থী। তিরিশ পার হয়ে ক্রমশ বুঝতে পারছি-পূর্ণতা বলে কিছু নেই।'

একসময় তো মান্নান ভাবতেন-'কবিতা হচ্ছে মুহুর্তের অগ্নি, তন্ময় জন্মক্ষণের দ্রুত বিদ্যুৎ, ক্ষণকালীন সমকালীন অস্থির ভাষ্য, স্বপ্নের ভগ্নাংশ, ভাবনার আকস্মিক ফেটে পড়া, শূন্যে জ্বলা হঠাৎ-আলোর ঝলকানি।' অথচ (এক চায়ের দোকানে) মান্নান আমার সাথে একমত হলেন, ঐ সব কথা সত্যি হয়েও কবিতা এক অনুশীলনের বিষয়, ক্রমবিবর্তনের বিষয়, ক্রমোন্নতির বিষয়।

সময় এক আশ্চর্য নিয়ন্ত্রক। যে মান্নান নির্জন, দুর্বোধ্য বলে বর্জিত ছিলেন, সেই মান্নানের সুহৃদ পাঠক কম নয়। 'কেউ কেউ আমার বিরোধিতা করেন। আমার শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস অন্যদের এই বিরোধিতা।' যাঁরা তাঁকে শিল্পীর আসরেই স্থান দিতে বিরোধিতা করেছেন তাঁরাই তাঁকে পরে সাদরে বিশিষ্ট আসন ছেড়ে দিয়েছেন। এর কারণ মান্নানের অক্লান্ত ক্রমঅগ্রসরমানতা। নিজে মান্নান অনেক কবি সাহিত্যিক লেখক সম্মন্ধে হয়তো বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন। আমরা দু'জনে বহু আলোচনায় মত্ত হয়েছি। মান্নানকে সাধারণ ভাবেই সেখানে পেয়েছি। কিন্তু যাঁকে যতটুকু প্রাপ্য সম্মান দেয়া দরকার, তা মান্নান দিতে ভোলেন নি। মান্নান ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বলেছেন, একজন লেখক হিসেবে তার যুগের অন্যান্য লেখকদের সম্মন্ধে তাঁর মূল্যায়ন তাঁর কর্তব্যের মধ্যে মনে করেন। এই বিশ্বাসে উদ্ধুদ্ধ হয়েই মান্নান এদেশের কবি-সাহিত্যিক সম্মন্ধে যত লিখেছেন আর কোনো লেখকই তা করেন নি, একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। মান্নানের 'মসৃণ প্রবহমানতা' মান্নানকে তাঁর ঠিক আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তবে অবশ্যই মান্নানের প্রবন্ধ, সমালোচনা, কবিতা, গল্প ও উপন্যাস পাঠকবর্গের গ্রন্থ-জ্ঞান বা পাঠ-ক্ষমতা ও সর্বোপরি বিশেষ উপলব্ধিকে পূর্বশর্তরূপে গ্রহণ করে, ঠিক যেমন 'ন্যূ ক্রিটিসিজম' প্রসঙ্গে পাউন্ড যা বুঝিয়েছেন।

অনেকে শিল্পে Commitment এর কথা বলেন। এ বিষয়ে মান্নান ও আমি মাঝে-মাঝে আলোচনা করেছি। একজন শিল্পীর Commitment বা সেই অর্থে অঙ্গীকারটা কি এবং কার কাছে? আমরা একমত হয়েছি–একজন শিল্পীর অঙ্গীকার, একজন রাজনীতিবিদের জনগনের কাছে, সমাজ বিজ্ঞানীর সমাজের কাছে, ধর্মপ্রচারকের ধর্ম বা ঈশ্বরের কাছে কিংবা সাধারণভাবে চিকিৎসকের রুগীর কাছে, আমলার সরকারের কাছে অঙ্গীকারের সাথে কোনক্রমেই তূল্য নয়। এ অঙ্গীকার এমন অঙ্গীকার যা শুধু নিজের কাছেই করা যায়। 'কিন্তু আমি তো বিশাল প্রবহমান মানবস্রোতের একখানি ঢেউ,– তাই আমি একই সঙ্গে এক ও অনেক। একা ও অনেকজন, একক কিন্তু আবার সমগ্রের প্রতিভূ। আমি ক্রমাগত নিজেকে রূপ দিচ্ছি। আমি ক্রমাগত নিজের ভিতর দিয়ে আরো অসংখ্যকে রূপ দিচ্ছি। আমি একা এবং বিচ্ছিন্ন। আমি বহু এবং যুক্ত।' ফলে নিজের কাছে অঙ্গীকার মানে বহুর কাছে অঙ্গীকার। কিন্তু এই অঙ্গীকার খেলো নয়–পবিত্র অথচ স্বাধীন, যেটা একমাত্র স্রষ্টার পক্ষেই সম্ভব। বাঁধা নেই কারো কাছে কারণ তিনিই ¯্রষ্টা অথচ বিচ্ছিন্ন নন। আমি স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী। কোনো সরকার, কি সমাজ, ব্যক্তি, কি রাষ্ট্রযন্ত্রের সাধ্য নেই আমাকে বাঁধন পরায়। আমি সরকারের অতীত, সমাজের অতীত, রাষ্ট্রযন্ত্রের অতীত। আমার সমস্ত শিল্পকাজ ডানাঅলা–এবং যে ডানা স্পন্দমান। আমার শক্তির উৎস আমার ভেতরে এবং তা অনিঃশেষ। কোনো বহিঃশক্তির সাধ্য নেই তাকে রুদ্ধ করে। আমার নিজেরও সাধ্য নেই। আমার শক্তি আমার চেয়ে শক্তিমান।" এ শক্তি সত্যিই অপ্রতিরোধ্য এবং আমি মান্নানের ভেতর তা দেখেছি। মনে পড়ছে 'রাত্রি' নামে কবিতা যে রাতে মান্নান লেখেন তার পরদিন সকালে দেখা। চেহারায় বলছে কিছু একটা সম্পন্ন করার পরিতৃপ্তি সেখানে। পড়ে শোনালেন। আমি মনে করি, ঐ নিজের কাছে অঙ্গীকার যে শিল্পী করতে পারবেন সেই এমন শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু এরপরও যেটা আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গ্যাছে তা 'আমার বিশ্বাস'-এ মান্নান উল্লেখ করেছেন। মান্নান তো আশাবাদী। কিন্তু 'রাত্রি' কবিতার প্রথম শব্দ 'রাত্রি' এবং শেষ শব্দ 'সূর্যোদয়'-এমন একটা Consummation বা পূর্ণতা এই শিল্পকর্মে ছিলো তখন ধরতে পারিনি যদিও আশাবাদটা আমার গভীরে বেজে উঠছিলো কবিতা পড়া শুনতে শুনতে। তাই ভাবি-'আমার বিশ্বাস' অনেক অজানা কথা বা অনেক অবহেলিত সম্ভাবনাকে নাড়া দিয়েছে নিঃসন্দেহে।

ঠিক এই অঙ্গীকার প্রশ্নেই ধর্মের কথা উঠে আসে। মান্নান বলছেন, 'কিন্তু আমি যে ধর্মসমাজের সন্তান তার কথাও আমি বিস্মৃত হইনি।' অথবা 'আমি বাঙালি এবং আমি মুসলমান। এর কোনো-একটিকে বাদ দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। বাঙালি-মুলমান হিসাবে আমি একটি জটিল মিশ্র ঐতিহ্যের ধারক।' অখন্ড অথচ স্বতন্ত্র ঐতিহ্য-চেতনা মান্নানকে জীবনানন্দ, ফররুখ আহমদ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, সুধীন দত্ত, শাহাদৎ হোসেন এবং বেগম রোকেয়া সম্মন্ধে লিখতে উৎসাহ দিয়েছে। ব্যক্তিগত ভাবে মান্নানকে আমি ধর্মে শ্রদ্ধাশীল দেখেছি-অথচ তিনি কিন্তু গোঁড়া অর্থে মোটেও ধার্মিক নন। যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অথচ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন-বিদেশী ভাষা ও সাহিত্য জানা লেখকের জন্যে বিশেষ প্রয়োজনীয়। ফলে বলতে পেরেছেন, 'আমি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক, আমি হিন্দু ঐতিহ্যের ধারক, আমি মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক।' যে কোনে শিল্পীই বিশ্বাস করবেন এবং অনুমোদন করবেন ঐতিহ্য-বোধ ছাড়া কোন শিল্পীই সামনে এগুতে পারে না। আমি মনে করি মান্নানের ঐতিহ্য-বোধ প্রখর বলেই 'জন্মান্ধ' কবি মান্নান 'পার্ক স্ট্রিটে' চলে আসতে পেরেছেন।

এ প্রসঙ্গে রাজনীতির কথা আসে। অনেকে মান্নানকে ভুল বোঝেন এবং ক্ষুদ্র পরিসরে তাঁর বন্ধু হিসেবে আমাকেও। আমরা দু'জনেই আসলে কোনো গোঁড়া রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাস করি-সবাই সুখী হোক, স্বচ্ছন্দ হোক, স্বচ্ছল হোক। এ বিশ্বে ঘৃণা না থাকুক, দারিদ্র না থাকুক, হত্যা না থাকুক, বঞ্চনা, প্রতারনা, যুদ্ধ-এমন ক্ষতিকর কিছু না থাকুক। কিন্তু এগুলোর জন্যে কোন্ রাজনৈতিক বিশ্বাস সবচেয়ে কার্যকরী হবে, তাই নিয়েই আবার যে যুদ্ধ, তা আমাদের হতভম্ব করে। শিল্প আমাদের সেই বিমূঢ়তাকে স্বাভাবিকে এনেছে। তাই কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস ব্যতিরেকে আমিও মান্নানের মতো বিশ্বাস করি-এ পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত, সুধীন দত্ত, শাহাদৎ হোসেন, ফররুখ আহমদ, মায়াকভস্কি, টলস্টয়, সেক্সপীয়র, ব্রেখট, লরেন্স, নেরুদা, ট্রাকল, হিমোনথ, প্যাষ্টারনক, বোদলেয়ার এরা এবং এমন আরও–মহৎ শিল্পী, কিন্তু কে কার চেয়ে বড় সে বিচারকে ঘৃণা করি।

আর একটি বিষয় মান্নান প্রসঙ্গে উঠে এবং 'আমার বিশ্বাসে'-এও মান্নান সে কথা কয়েকবার উল্লেখ করেছেন। সেটা হলো 'যৌনতা'। আমার মনে পড়ছে, অনেক সমালোচকই সাম্প্রতিক মান্নানকে দুর্বোধ্য বলা ছেড়ে যৌনতাড়িত বলে নিন্দা করছেন। মান্নান কি সর্বক্ষণই যৌনতা'র গল্প করেন? কিংবা সর্বক্ষণই যৌনতা'কে একটি প্রাণধারক শক্তি বলে মনে করেন? আসলে এর একটিও নয় এবং সেকথা আমার চেয়ে সতেজ কেউ বলতে পারবে না। মান্নান যৌনতা'কে কি চোখে দেখেন তার ব্যাখ্যা, আগেই বলেছি, এই বইয়ে দিয়েছেন, 'আমার সাহিত্যজীবনের প্রথম থেকেই বস্তু পৃথিবী এবং অবস্তু পৃথিবী দুই-ই আমাকে সমভাবে আকর্ষণ করেছিলো। ফলে আমার গল্পে সব সময় শয়তানের রাজত্ব, সব সময় ফেরেশতার আহবান।'-অনেকটা কি জরাথুস্ত্র বা খলিল জিব্রানের জীবনদর্শনের মতো? সব ব্যাপারেই মান্নানের এক শারীরিক দর্শন আছে বটে-যেমন তিনি ভাবেন-তাঁর 'গদ্য দিবস-পুরুষ, কবিতা নারী-রাত্রি' কিংবা 'নিবিড় পাঠের মধ্য দিয়ে শরীর থেকে বিষয়ের আত্মার দিকে যাওয়া'। আবার বলেছেন, 'আমার গল্প উপন্যাসেও অনেকের বিবেচনায় শরীর এক প্রধান ব্যাপার, আমার সমলোচনাতেও তাই।' আসলে মান্নানের কথাতেই আবার বলতে হয়-তাঁর লেখায় মিশেছে 'যৌনতার সঙ্গে আধ্যাত্মিক এষণা'। শরীর থেকে অ-শরীরে যাত্রা।

আমাদের আলোচনায় একথা বার-বার উল্লেখ করেছি বিভিন্ন চা-খানায়, 'যৌনতা জীবনের সর্বময় কেন্দ্রবিন্দু নয়, কিন্তু সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই'। মান্নান যৌনতাকে ঐ সৃষ্টির মন্ত্র হিসেবেই যে নিয়েছেন তা স্পষ্ট, কারণ শেষাবধি মান্নান সচল স্রষ্টা। শ্লীলতা ভাল-কিন্তু সৃষ্টির জন্যে অনেক ক্ষেত্রেই শ্লীলতা হানিকর। যৌনতা কোনো বিকৃতি নয় বরং ওটা জীবনের নিয়মানুগ, একথা যে অস্বীকার করবে সে জীবনকে অস্বীকার করবে-সে অবশ্য বিকৃতমনা। ঠিক এই বিকৃতি থেকেই মান্নানের শিল্পকর্ম বিচার সম্পূর্ণরূপে যৌনতাতাড়িত মনে হতে পারে। অবশ্য মান্নানের এমন সমালোচকের প্রয়োজন আছে।

সবশেষে যে কথা বলতে চাই তা হলো 'আমার বিশ্বাসে'-এ মান্নান কিছু Confession করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন তিনি কপট নন, ভণ্ড নন এবং তাঁর 'নিজ' সম্পন্ধে ধারণা অতি প্রখর। যেমন-

(১) আমার রচনা আমার কোটি-কোটি ভাবনা-নক্ষত্রের কয়েকটি মাত্র। বিশ্বচরাচরের মতোই আমার অনেকখানি অগোচর। কেবল কল্পনা ও অনুমান-সাধ্য।

(২) আমার কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র সব সময়ই আমি। নৈব্যর্ক্তিক কবিতা বলে কোনো-কিছু আমি স্বীকার করি না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক