ড. সামসুল হুদা হারুন: আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে

admin
Published : 28 Jan 2020, 01:21 PM
Updated : 28 Jan 2020, 01:21 PM

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জালাল ফিরোজ ও রাজু আলাউদ্দিন

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। গ্রন্থকার ও গবেষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি বই পার্লামেন্টারি বিহেভিয়ার ইন এ মাল্টিন্যাশনাল স্টেটস: বাংলাদেশ এক্সপিরিয়েন্স ১৯৪৭-১৯৫৮বাংলাদেশ ভোটিং বিহেভিয়ার: এ সিফোলজিক্যাল স্টাডি। বৃটেন ও আমেরিকায় তিনি একাধিক বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ২০০৮ সালের ৪ অক্টোবর তিনি ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সাক্ষাৎকারটি ১১-০৮-১৯৯৬ সালে বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

জালাল ফিরোজ: ভোটিং বিহেভিয়ার-এর উপর আপনার বই আছে। '৭৩ সালের বাংলাদেশের মানুষের যে ভোটিং বিহেভিয়ার ছিলো '৯৬-এর ভোটিং বিহেভিয়ারের মধ্যে আপনি কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন?
ড. সামসুল হুদা হারুন: মৌলিক প্রভেদ রয়েছে। এই জন্যে বলছি যে, মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ সফল মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া– এই প্রেক্ষিতে নির্বাচনটা হয়েছিলো। অর্থাৎ স্বাধীনতাযুদ্ধের একটা বৈধতা বা অনুমোদন বা ভেলিডেশন নেয়ার ব্যাপার। এটা অন্যদিক থেকেও জড়িত যে অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশের প্রতি মান্যতা নেয়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। এবং সেখানে নির্বাচনে জনগণের রায়, এটা যদি ওভারহোয়েলমিং হয়ে আসে স্বাধীনতার স্বপক্ষের দলের পক্ষে তা হলে যে প্রোপাগান্ডা তৎকালীন সময়ে ছিলো, অর্থাৎ ইন্ডিয়া তথা রাশিয়া–এদের কারসাজিতে পুরো জিনিসটি হয়েছে–এটাই ছিলো পাকিস্তানের প্রোপাগান্ডা। প্রোপাগান্ডার যে বাবলটা, দ্যাট ক্যান বি ওয়েল প্রিকট বাই দ্য পিপল। এই জন্যে বলছিল যে, ৭৩-এর ইলেকশনটা নরমাল বা কনভেনশনাল সেন্সে যে ইলেকশন সেটা ছিলো না। তেমনি ১৯৭০-এর যে ইলেকশন সেটা কনভেনশনাল ইলেকশন না। একটি আন্দোলনের ওপর গণভোট, যদিও নাম দেয়া হয়েছে ইলেকশন। ঠিক তেমনি ৭৩-এর ইলেকশন আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটি একটি কনভেনশনাল ইলেকশন না। এটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা প্রাপ্তির ওপর একটি অনুমোদন লাভ যাতে করে ঐ সময়ের জনগণের আন্দোলন বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। এই গেল একটা দিক। আরেকটি দিক হচ্ছে– প্রতিষ্ঠান গঠনের ব্যাপারে–পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিলো ১৯৪৭ সালে। এবং জেনারেল ইলেকশন হয় ১৯৭০ সালে। তো কত বছর?
রাজু আলাউদ্দিন: ৪৭ থেকে ৭০, ২৩ বছর।
ড. হারুন: এই ২৩ বছরের মধ্যে কোন জেনারেল ইলেকশন হয়নি এবং তার ফলেই পাকিস্তানের কোন ইন্সটিটিউশন বা ফাউন্ডেশন দৃৃঢ় হতে পারেনি। এবং সেই জন্যেই যে ভুলটা পাকিস্তান করেছিলো বঙ্গবন্ধু সেই ভুলটা করেননি। করেননি এই কারণে যে তার যে ক্রেডেনশিয়াল ছিলো, তার যে লীডারশীপ ক্যাপাসিটি সেই মুহূর্তে ছিলো, তার যে গ্রহণযোগ্যতা ছিলো তা দিয়ে অনায়াসে পুরনো ইলেকটেড ম্যাম্বার্স দিয়ে আরো ক বছর চালিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। তিনি নতুন ম্যান্ডেট নিতে চলে গেছেন। তাতে হয়েছে কি পার্লামেন্টারী সিস্টেম অব গভমেন্টের প্রতিষ্ঠা এটা আরো দৃঢ় হয়েছে। এর আরো একটি দিক রয়েছে, কনস্টিটিউশনকে তিনি দ্রুততার সাথে রচনা করলেন। এবং এটাকে আরো লেজিটিমাইজ করলেন, বাস্তবায়ন করলেন বাই হোল্ডিং এ জেনারেল ইলেকশন। সুতরাং যে জিনিস করতে পাকিস্তানের ২৩টি বছর লেগেছিলো বঙ্গবন্ধু তা দু'বছরের মধ্যে করে ফেললেন।
অন্যদিকে ৯৬-এর ইলেকশনটা একটু ভিন্ন রকমের। এটি মোটামুটি একটা কনভেনশনাল ইলেকশনের মধ্যে পড়ে। মোটামুটি বলছি এই কারণে যে আমাদের দেশে ধারাবাহিকভাবে ইলেকশন কোন সময়ই হয়নি। কারণ যখনই কেউ ক্ষমতায় আসে তখন পিরিওডিক্যাল ইলেকশন দেয়ার ব্যাপারে তাদের শৈথিল্য সব সময়ই দেখা যায়। ৭৫-এর পর সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে যায় ইনপুট সাইডে, কতগুলো নতুন ফ্যাক্টর রাজনীতিতে এসে গেল। সেনাবাহিনীর আবির্ভাব ঘটলো রাজনীতিতে। আর রাজনীতিতে যখনই আসে দে এন্টার লাইক এ বুল ইন এ চায়না সপ। সবকিছু তছনছ করে ফেলে। সুতরাং আর্মি অন দি ইনপুট সাইড অফ পলিটিক্স-এ যখন আসলো, এগজিসটিং পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং পলিটিক্যাল পার্টি দারুণভাবে পরিবর্তন হলো এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। আরেকটি হচ্ছে ৭৫-এর পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেসব স্টেট প্রিন্সিপ্যাল ছিলো, সেগুলো আমূল পরিবর্তন হওয়াতে অন্য ফোর্সগুলো পলিটিক্যাল পার্টির ভেতরে এসে গেলো। তার মানে একটা মার্কেট পলিটি সিস্টেমে এসে দাঁড়ালো।
রাজু: ৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং জুনের নির্বাচনের মধ্যে বিহেভিয়ারিয়াল চেঞ্জটা কেমন মনে হয়েছে আপনার?
ড. হারুণ: প্রথম কথা হচ্ছে ফেব্রুয়ারির যে ইলেকশনটা ছিলো সেটি একটা নন কমপিটেটিভ ইলেকশন।
রাজু: ওয়ান পার্টি ইলেকশন।
ড. হারুন: হ্যাঁ, ওয়ান পার্টি ইলেকশন। কমপিটিশন ছিলো না। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো না। সুতরাং যদি বিরোধী দলগুলো না থাকে, প্রতিযোগিতা না থাকে তাহলে যথার্থ গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয় না। ইলেকশনটা তো অনেকটা ফ্রি ইকোনোমির মত, জনসাধারণ ভোট দেবে অন দ্য বেসিস অব চয়েসেস। এখন চয়েস যদি সীমাবদ্ধ থাকে তা হলে এই চয়েসটা এক্সর্সাইজ করা যায় না।
জালাল: তা হলে কি এই সেন্স থেকে ৭৩-এর ইলেকশন এবং ৯৬-এর ফেব্রুয়ারির ইলেকশনের মধ্যে একটা মিল দেখতে পারি?
ড. হারুন: না, না। এটা তো ডায়ামেট্রিক্যালি অপোজড। কারণ সেখানে বহুদল অংশগ্রহণ করেছে। সেখানে চয়েস তো ছিলো। সেখানে জামাতে ইসলাম, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম–দে অয়ার নট এলাউড টু কনটেস্ট দ্য ইলেকশন। বাট অল দি আদার পলিটিক্যাল পার্টিজ অর্থাৎ ভেরিয়াস লেফটিস্ট পলিটিক্যাল পার্টিজ, জাসদ তারাওতো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং মজার ব্যাপার হলো ঐ সময় জাসদ যে ভোট পেয়েছিল তার অধিকাংশই এ্যান্টিলিবারেশন ফোর্স থেকে আসা। এটা আমার ডেপথ রিসার্চ-এর ধারণা থেকে আসা। এই জন্যে কথাটা বলছি যে এটা হচ্ছে ইনডাইরেক্ট ল্যাশিং, ব্যাক ল্যাশিং। তখন আওয়ামী লীগের ফ্রন্টল্যাশ জাসদ করেছে আর ব্যাকল্যাশ করেছে এ্যান্টিলিবারেশন ফোর্সেস। যখন জাসদের মিটিংয়ে অসংখ্য লোক হয় তখন ইট ইজ নট আউট অব লাভ ফর জাসদ, বাট ইট ইজ আউট অব হেটরেড ফর আওয়ামী লীগ। দ্যাট ইজ দ্য পয়েন্ট।
রাজু: আচ্ছা ফেব্রুয়ারিতে যে ইলেকশনটা হলো এটা কি জুনের নির্বাচনে যাওয়ার জন্যেই, মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যাওয়ার জন্যে এসেনশিয়াল ছিল? এই একদলীয় নির্বাচনটা কি খুব জরুরী ছিলো? নাকি ইচ্ছে করলে এভয়েড করতে পারতো?
ড. হারুন: ইটস এ গুড কোশ্চেন। এখন মুশকিলটা হচ্ছে কি আমাদের রাজনীতি যেহেতু খুব সফস্টিকেটেড না, প্রাইমারী স্টেজে আছে। সুতরাং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইনস্টিঙ্কট, লাইকস এন্ড ডিজলাইকস দিয়ে রাজনীতি প্রভাবিত হয়। একটা স্ট্যান্ড বিএনপি নিয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্যেই এটা করছে। কিন্তু এটায় তারা বিশ্বাস করে না। দে আর অন রেকর্ড। নেভারদিলেস তারা ৯০ এর ইলেকশন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্ডারেই করেছিলো। তবুও তারা এটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু তারা তাদের স্ট্যান্ডকে রেশনালাইজ করার জন্যে, এর যৌক্তিকতা দেখাবার জন্যে দে আর টেকনিক্যালি রাইট–নাউ দ্যাট উই ডু নট হ্যাভ টু থার্ড, মেজরিটি ইন দ্য পার্লামেন্ট, উই হেভ নো আদার অলটারনেটিভ দ্যান টু হোল্ড দ্য জেনারেল ইলেকশন। এটার প্রেক্ষিতে, পরবর্তীতে টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সংবিধানে আনা সম্ভব। এটা হচ্ছে র‌্যাশনালাইজেশনের প্রশ্ন। কিন্তু রিয়াল পলিটিক্যাল উইল যেটাকে বলা হয় ফর গ্রেটার ইন্টারেস্ট অব দ্য কান্ট্রি, মানে যে জিনিসটা তারা করলো আফটার ফাইভ ইয়ার্স এটা তারা ৩ বছর আগেও করতে পারতো। এগুলো পলিটিক্যাল উইলের ওপর নির্ভর করে। বিএনপি কনস্টিটিউশনাল যে অবলিগেশনের কথা বলেছে তা টেকনিক্যালি রাইট যে তার টু থার্ড নেই। কিন্তু এ জিনিসটা এভয়েডও করতে পারতো। এ জিনিসটা একটু ইঞ্জিনিয়ারিং টাইপের মনে হচ্ছিলো। এই ইলেকশনটা করে যেভাবে আর্মি ডিপলয়মেন্টটা হলো, সবকিছু মিলে এবং পরবর্তীতে যে ইনফ্লেটেড পার্সেন্টেজ অব ভোটিং দেখানো হলো তাতে করে আমার এই ধারণা হয়েছে যে, ফেব্রুয়ারির ইলেকশনে বিএনপি'র ইমেজ অনেকখানি টার্নিশড হয়েছিলো ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে। আমার ধারণা ইন্টারন্যাশনাল লবি ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে বিএনপি'র প্রতিকূলে যতখানি ছিলো না, ১৫ ফেব্রুয়ারির পরে বিএনপি'র ইমেজ অনেকখানি নষ্ট হয়েছে।
রাজু: আওয়ামী লীগ তো ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলো না, কিন্তু পরে তো আবার এটা মেনে নিতে বাধ্য হলো তারা।
ড. হারুন: ইটস এ পয়েন্ট। কিন্তু কথা হচ্ছে কনস্টিটিউশনে বহু সংশোধনী আছে যেগুলো সিভিল সোসাইটির কাম্য নয়। বিরোধী দল ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মেনে নিয়েছিলো এই কারণে যে তা না হলে হয়তো আইবল টু আইবল কনফ্রনটেশন হতো। রক্তাক্ত অবস্থা হতো বাংলাদেশের। তৃতীয় শক্তি এসে যেতো। এটা তো কারোরই কাম্য নয়। কথা হলো রাজনীতি যেভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত সেভাবে হয় না। হ্যাঁ, ইউ আর এ্যাবসুলটলি রাইট যে ফিফটিন ফেব্রুয়ারি আমরা মানছি না, দ্যাটস ট্রু। কিন্তু ফিফটিন ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষিতে যে সংশোধনীটা আসছে তাতে করে একটা বিরাট সংঘর্ষ থেকে আমরা বেঁচে গেছি। পরবর্তীকালে এর সুরাহা হতে পারে সাংবিধানিক বিবর্তনের মাধ্যমে। আমাদের সংবিধানে যে সংশোধনীগুলো আছে, যেগুলো গ্রহণযোগ্য না, যেমন ইনডেমনিটি, মানে আপনি কাউকে খুন করে সংবিধানে বৈধতা পাবেন- এটা কি কাম্য? এক সময় আমেরিকাতে ছিলো জিম ক্রো ল: ইকোয়াল বাট সেপারেট। কালো এবং সাদার ব্যাপার। এটা তো কন্ট্রাডিকটোরী টার্ম। পরবর্তীকালে এই জিম ক্রো ল আর থাকলো না। এটাওতো সাংবিধানিক সংশোধনীর ফলেই ঘটেছে। আমেরিকান কনস্টিটিউশন ১২ কি ১৪ পৃষ্ঠার ছিলো, এখন এটা কেতাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এই ফেব্রুয়ারির ইলেকশন, যেহেতু এটা কমপিটেটিভ না, তাই এটা গ্রহণ করি না। কিন্তু যখন এ্যামেন্ডমেন্ট হয়ে গেল, এ্যামেন্ডমেন্ট করে কিন্তু পার্লামেন্ট ডিড নট আউটলিভ ইটস ইউটিলিটি। সঙ্গে সঙ্গে ইট ডিজলভড ইটসেল্ফ। এখানেও কিন্তু বিএনপির একটা পয়েন্ট আছে সেটি হচ্ছে আমরা শুধু এ্যামেন্ডমেন্টটাই করতে চেয়েছিলাম। সেই জন্যেই উই হেল্ড দ্য ইলেকশন। আর এর ফলেই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসেপ্টটা আইনগতভাবে এলো। এখন অপজিশন বলতে পারে যেহেতু ঐ ইলেকশনটাই ভ্যালিড না এবং যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছে তারাও ভ্যালিড না, সুতরাং এ্যাজ এ কনসিকোয়েন্স সংশোধনীটাও ভ্যালিড না। হ্যাঁ, এটাও একটা স্ট্যান্ড হতে পারে। এখন কোন পথে? পলিটিক্যাল লাইফ ইজ এ ম্যাটার অব চয়েস। উই হ্যাভ টু চুজ বিটুইন লট অব অলটারনেটিভস। এটা যদি না হতো তাহলে সংঘর্ষ হতো। আরও অবনতির দিকে যেতো। তাছাড়া বহুদিন পর পলিটিক্স ডিমিলিটারাইজড, সেখানে আবার মিলিটারাইজেশন হতে পারে। সুতরাং সবই আইডিয়াল হয়েছে তা না। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিক সংস্কৃতি যেহেতু অত্যন্ত অপ্রতুল তার ফলেই এটা ঘটেছে। আমরা সবকিছুই তো ইনস্ট্যান্ট কফির মতো পাচ্ছি না, যেটা চাওয়া মাত্রই পেয়ে যাবো।
রাজু: সংসদে এই যে যারা জনপ্রতিনিধি, সরকারি দলের কিংবা বিরোধী দলের এদের ভূমিকাটা কী রকম হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ড. হরুন: মানে বিরোধী নেতা এবং নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী বা ট্রেজারি বেঞ্চের যিনি নেতা–এই দুইই এই সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভস্বরূপ।
প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌরজগতের সূর্য, যাকে ঘিরে সবকিছু আবর্তিত হয়। অপজিশনের প্রধান কাজ হচ্ছে টু মেক দ্য গভর্নমেন্ট বিহেভ…. অপজিশনের কাজটা হচ্ছে টু অপোজ, এই জিনিসটা যেন আমরা ভুলে না যাই। অপজিশনের কাজটাই হচ্ছে সে বিরোধিতা করবে এবং সে দেখবে সরকার সঠিক আচরণ করছে কিনা এবং এর কোন বিচ্যুতি যেন না ঘটে। এটা তাকে সবসময় করতে হবে। এবং সব সময় এটা করার পেছনে একটা জিনিস থেকে যায় যে তাকে যদি এই সুযোগটা দেয়া হয় সে এর থেকে ভালো করবে। অপজিশন ইজ দ্য ইমপর্টেন্ট পার্ট অব দ্য পার্লামেন্টারী সিস্টেম অব গর্ভনমেন্ট। এই জিনিসটা, সাধারণত আমাদের দেশে রাজনীতি যারা করেন তারা এটা ভুলে যান। ক্ষমতায় যে-ই আসুক মনে করে যে না, এটা না।
কিন্তু পার্লামেন্টারী সিস্টেমে এটাই আসল। তবে অপজিশনের একটা আনুগত্য থাকতে হবে। আনুগত্য টু সিস্টেম, নট টু দ্য গভমেন্ট। আনুগত্য টু দ্য রুলস অব দ্য গেম। আমরা যে ফুটবল খেলছি, রেফারিকে মানতে হবে। নির্দিষ্ট লাইনের বাইরে চলে গেলে অফ সাইড হয়ে যাবে। এভাবে হলে হ্যান্ডবল হয়ে যাবে। এইখানেই লয়ালটি টু দ্য গেম। অর্থাৎ সরকার মানে মেজরিটি, মেজরিটিজ ভিউজ, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের যে মতামত–এটাই প্রতিফলিত হচ্ছে পার্লামেন্টে। এই কথাটা কিন্তু সবসময অপজিশনের মনে রাখতে হবে। অর্থাৎ চার বছর কি পাঁচ বছর যে ক্ষমতায় আছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে, বিরোধিতা তুমি করবে– এটা তোমার রাইট কিন্তু এটা সরকারেরও রাইট টু হ্যাভ ইটস ওউন ওয়ে। অপজিশন উইল অপোজ, বিরোধিতা করবে কিন্তু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। সরকার বিরোধী দলকে স্তব্ধ করেব না বাট গভমেন্ট ইজ এনটাইটেল্ড টু উইন আলটিমেটালি বিকজ অব দি মেজরিটি। এটাতো রুলস অব দ্য গেম। অপজিশন সমস্ত রকম বিরোধিতা করবে কিন্তু সরকারকে জিততে হবে এবং সরকারের যেটা যেটা করতে হবে তা হলো তাকে শুনতে হবে অপজিশন কী বলছে। এইটা সরকারকে ধৈর্য্যসহকারে শুনতে হবে। দ্যাট ইজ দ্য প্রাইস অব গেটিং থিংস ডান। আমরা বলছি যে আইডিয়ালি স্পিকিং কী করা উচিৎ। আইডিয়াটা হচ্ছে দুয়ের মধ্যে একটা কনফ্রন্টেশন। এটাকে আক্ষরিক অর্থে নেয়া হবে না। এটা অনেকটা ইলেক্ট্রিসিটির মত। যেমন পজেটিভ নেগেটিভ একত্রিত হলে যে পাওয়ার জেনারেটেড হয়, তেমনি পজিশন এবং অপজিশনের কনফ্রন্টেশনে এবং কনসিলেশনে–এই দুয়ের মাঝখান থেকে একটা ফরমুলা বেরিয়ে আসে। যেহেতু কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবে না এ জন্যে যে নির্বাচকম-লী লক্ষ্য করছে কার কী পারফরমেন্স। তুমি যদি এটাই কর, তাহলে তোমাকে আমি ভোট দেবো না। দ্যাট ইজ দ্য পয়েন্ট।
রাজু: সরকার তো ধৈর্য্য সহকারে গতকালের সংসদ অধিবেশনে শুনতে পেলো বিরোধী দলীয় নেত্রীর মুখ থেকে 'বেয়াদব' শব্দটি।
ডঃ হারুন: হ্যাঁ।
রাজু: তাই না?
ডঃ হারুন: হ্যাঁ।
রাজু: আমি বলতে চাচ্ছি যে আমাদের সংসদে থিউরিটিক্যালি যা হওয়া উচিত, আর বিরোধী দলের সংষদ সদস্যরা যা করছেন তার সাথে দূরত্ব কতখানি?
ডঃ হারুন: এটা তো ইঞ্চি দিয়ে মাপা যাবে না। কথা হচ্ছে থিউরিতে যা থাকে এবং দুই পক্ষে যেটা ঘটে এবং বাস্তবিক পক্ষে যেটা ঘটে এই দুইটা পৃথিবীর কোথাও মিল থাকে না।
রাজু: একটা জায়গায় মিল দেখলাম, ঐ যে হ্যান্ডবলের কথা বললেন, দেখা গেলো এ আঙ্গুল শো করে, হাত দেখায়। এই ধরনের জিনিসগুলো বেশ হচ্ছে। এই দিক থেকে কিছুটা মিল আছে।
ডঃ হারুন: আপনি বলছেন সাম্প্রতিকালের বেয়াদবির কথাটা এবং আঙ্গুলের ব্যাপারটা। এ ধরনের কিছু দেখালেই যে সরকার এটা নিয়ে হৈচৈ করবে এটার কোন কারণ নেই।
রাজু: এটা তো আপত্তিকর।
ডঃ হারুন: এটা জনসাধারণ দেখছে। জনসাধারণ শুনছে এবং এটা যে করছে ইট উইল বি কস্টলি ফর দি অপজিশন।
রাজু: কিন্তু আমার কথা হচ্ছে বেয়াদব বা বেয়াদবি করা বা এই যে নিয়ম ভায়োলেট করা– এটার কথা বলছি। সংসদের তো কিছু নিয়মকানুন আছে।
ড. হারুন: এটা ল না। এটা ঠিক ল না।
রাজু: তাহলে আমি যদি সংসদে থাকি, ধরা যাক আমি একজন এমপি আমি যদি গালাগাল করি অন্য কাউকে। এটা কি রেশনালি করতে পারবো?
ডঃ হারুন: না না। এটা কেউ বলছে না।
রাজু: এটা কি এলাউড হবে?
ডঃ হারুন: নিশ্চয়ই না।
রাজু: এটাই জানতে চাচ্ছি আমি।
ডঃ হারুন: যেটা অভভিয়াস, কিন্তু…
রাজু: সেটা হয় না কেন ? তার মানে কিছু নিয়ম আছে। এটা যে এলাউড না, তার মানে কিছু নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতেই তো আপনি এটা এলাউ করবেন না।
ডঃ হারুন: রুলস অব প্রসিডিউর তো আছে।
রাজু: হ্যাঁ, আমি সেটাই জানতে চাচ্ছি।
ডঃ হারুন: রুলস অব প্রসিডিউর আছে। কিভাবে এড্রেস করতে হবে। কিভাবে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করতে হবে। কিভাবে কল এটেনশন, কিভাবে সাপ্লিমেন্টারী প্রশ্ন করতে হবে ইত্যাদি। সবকিছুরই রুলস অব প্রসিডিউর আছে। অনেক সময উত্তেজনার বশে অনেক কথা হযতো বলে। অনেক সময় হয়তো শালীনতার বাইরে চলে যায়। কিন্তু এই বলাটা এবং না বলাটা তো রপ্ত করতে হবে। দ্যাট ইজ এ ভেরী ইস্পরটেন্ট থিং। এবং এটার অনুশীলন দরকার। এই যে বেয়াদবী কথাটা, এই শব্দটাতো বাংলা নিশ্চয়ই না। ফারসী শব্দ। অর্থাৎ একটা অসৌজন্য ব্যাপার। যদি বলে থাকে যে অসৌজন্য ব্যাপার তাহলে তো গালি হয়নি।
রাজু: শব্দ কিন্তু তার এই রকম অর্থে থাকে না। কালে কালে; পলিটিক্যাল কারণে বা কালচারাল ইভ্যুলেশনের কারণে শব্দের অর্থ বদলে যায়। যেমন 'সামান্য'-এই শব্দটি এক সময় ইউনিভার্সাল অর্থে ব্যবহৃত হতো, শঙ্কারচার্যের সময়। কিন্তু এখন আর শব্দটাকে এই অর্থে কেউ নেয় না। 'সামান্য'কে খুব তুচ্ছ অর্থে নেয়া হয়। এখন 'বেয়াদব' যে শব্দটা, আপনি ঠিকই বলেছেন, অরিজিন্যালি এটা অসৌজন্যমূলক অর্থে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু এখন আমরা দেখি যে বেয়াদব বলতে 'অসভ্য'ও বুঝানো হয়।
ডঃ হারুন: শুনুন, এমনটি ওয়েস্টমিনিস্টার সিষ্টেমে, এটাতো বলা হয় যে এটা আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের মাতুলালয়। সেখানেও একটা পর্যায় ছিলো এ ধরনের অশালীন আচরণ করা হতো।
রাজু: আমার প্রশ্নটা হচ্ছে এগুলো হয়তো পঞ্চাশ বছর বা ষাট বছর আগে হতো ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে। আমরা কি এখন ঠিক ঐ জায়গা থেকে শুরু করবো? না কি ঐ সময় যা হয়েছে তারপর থেকেই আমরা শুরু করবো?
ডঃ হারুন: কথা হচ্ছে এগুলো আইডিয়াল সিচুয়েশন না। এগুলো বাই এন্ড লার্জ পৃথিবীর সমস্ত পার্লামেন্টে কোন না কোন সময় অসতর্ক মুহূর্তে আনউইলিংলি বা ইনএ্যাডভারটেটলি এ সমস্ত কথা মুখ থেকে নিসৃত হয়। এগুলো অনুশীলনের ব্যাপার আছে। এখানে পার্লামেন্টারী সিস্টেম অব গভর্নমেন্ট কোন সময়ই ধারাবাহিকতার সঙ্গে চর্চা করা হয়নি। প্রশাসন চিরস্থায়ী, সংসদ কালেভদ্রে–এ দেশে এটাই নিয়ম। দশ বছর, পাঁচ বছর, পনের বছর পর আসলো, ওয়ানস ইন এ ব্লুমুন আবার মার্শাল ল, আবার সেই অমাবস্যার রাত, আবার হঠাৎ করে সূর্য উদিত হলো। নেচারালি আমরা যখন গণতান্ত্রিক আওতায় বা পরিবেশে চলে আসি তখন পরিস্থিতিটা হয় সেই রিপভ্যান উউঙ্কেলের মতো, একশ বছর ঘুমিযে থাকার পর মুখে এতগুলো দাঁড়ি মোচ নিয়ে উঠে বসে থাকি। ঠিক তেমনি হঠাৎ করে পার্লামেন্টে গিয়ে একটা সফিস্টিকেটেট রিফাইনড পলিশড পার্লামেন্টারী বিহেভিয়ার হয় না। সুতরাং কোন শব্দ যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, ইট ইজ ট্রু যে পরবর্তীকালে এটা আস্তে আস্তে কমে যাবে। দেখেন, ম্যান লাইক শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এদের মধ্যে যখন ডায়ালগ হতো, এগুলো তো কোন ছাড়, মনে হতো যেন কুরুক্ষেত্র। যেমন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেরেবাংলাকে সংসদে বলছিলেন–দু'জনেই গ্রেট ওরেটর এবং গ্রেট পার্লামেন্টারিয়ান আফটার টুয়েন্টি ফাইভ মিনিটস অব হিস্ট্রিওনিক বেথস…শেরেবাংলা দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, এ্যাম আই টেলিং এ লাই অব দ্য গ্রেটেষ্ট অব অল লাইয়ার্স ইজ টেলিং এ লাই। কিন্তু আবার পরবর্তীকালে একে অন্যকে লীডার বলে সন্বোধন করছে। এগুলো হয়। অন দ্য স্পার অব দ্য মোমেন্ট হয়, বাট ইফ ইট ইজ এজ এ রুল হয়, দ্যাট ইজ রং। এখন যদি দৈনন্দিন আপনাকে বেয়াদব বলছি, দৈনন্দিন আমরা টেবিল চাপড়াচ্ছি, দৈনন্দিন আপনাকে জুতো দেখাচ্ছি, দৈনন্দিন আপনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছি–এটাতো কাম্য নয়। তাও বিশেষ করে যিনি লীডার, তাকে তো ফলো করতে হবে। ফলোয়াররা যদি দেখে লীডাররা অসতর্ক মুহূর্তে কিছু একটা বলছে দ্যাট ইজ ডেফিনেটলি নট কন্ট্রিবিউটারী টু পার্লামেন্টারী বিহেভিয়ার। এখন কথা হচ্ছে আমি কোনটাকেই র‌্যাশনালাইজ করতে চাই না। জাপানি পার্লামেন্টে তো একবার ছুরিও মারা হয়।
রাজু: ইদানীং? এখনো?
ডঃ হারুন: আমি একবার হাউজ অব কমন্সে বসা। নামটা আমার মনে নেই, খুঁজলেই পাওয়া যাবে। একজন বর্ষীয়সী পার্লামেন্টারীয়ান। স্পীকার বলছেন যে আপনি বসুন। সে বসছে না। সে আসন ত্যাগ করে স্পীকারের সম্মুখে চলে যাচ্ছে। পরের দিন কাগজে, টাইম-এর মত কাগজে লিখছে 'উনি কি করতে যাচ্ছেন?' উনি কি মেইজ ধরে ফেলে দিতে যাচ্ছেন? তার আগেই স্পীকার কল্ড দি সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস। সি ওয়াজ কনডাক্টেড আউট সাইড দ্য হাউজ অব কমন্স। এটা ঘটেছে সিক্সটিজ-এর দিকে। ঐ সময় আমি সেখানে পিএইচডি করছিলাম। প্রায়ই হাউজ অব কমন্সে যেতাম। তো ঐ সংসদ সদস্যা মেইজটার সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন, এটা একটা পবিত্রতর জিনিস। এসব ঘটনা ঘটে।
জালাল: আসলে উনি ঐ দিকে যাচ্ছিলেন কেন ? মেইজটা ফেলে দেয়ার জন্যে?
ডঃ হারুন: হোয়েন স্পীকার ইজ আস্কিং ওয়ান অব দ্য মেম্বার্স প্লিজ সিট ডাউন। সেটা না করে সি ওয়াজ এডভান্সিং টুয়ার্ডস দি স্পীকার। সুতরাং তার এই যুদ্ধংদেহী ভাব দেখেই সার্জেন্ট দিয়ে তাকে হাউজ অব কমন্স থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। এই ঘটনা তো ঘটেছে। আমাদের তৎকালীন পাকিস্তান আমলেও লেজিস্লেটিভ এসেমব্লীতেও তো মারা গেল। সুতরাং এগুলো হয়। সুতরাং, প্রিমোর্ডিয়াল স্টেজে এসব ঘটনা ঘটে।
রাজু: আচ্ছা এই প্রসঙ্গে আমি একটা সম্পূরক প্রশ্ন করতে চাচ্ছি। জনগণ যদি পার্লামেন্টে তাদের এই বিহেভিয়ার দেখতে পায় বা দেখার সুযোগ পায় তাহলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কাদেরকে ভোট দেয়া উচিত। আমাদের এখানে আগে কখনো টিভির মাধ্যমে সংসদের কর্মকাণ্ড দেখানো হতো না। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে টিভিতে এই অধিবেশনগুলো নিয়মিত দেখানো উচিত কিনা? আপনি এই বিষয়ে কিছু বলেন।
ড. হারুন: ভেরি গুড কোশ্চেন, ভেরী গুড কোশ্চেন। আমরা সব সময় এই পার্লামেন্টারী সিস্টেম অব গভর্নমেন্টের কথা বলতে গেলেই ইংল্যান্ডের দোহাই দেই। সেখানে কি হচ্ছে? সেখানে একটা সময় পার্লামেন্টের ভেতরে ক্যামেরা নেয়া মহাপাপ ছিলো। সেখানে পারফর্মেন্সটা কেউ দেখতে পারতো না। হ্যান্সার্ড বলে হাউজ অব কমন্সে এক ভদ্রলোক ছিলেন তিনি সংসদে কি বলা হতো তা লিপিবদ্ধ করতেন। সুতরাং সেখানে পারফর্মেন্সটা কেউ দেখতে পেত না, সেটা কাগজে বেরিয়ে আসতো। তার সঙ্গে সেখানে রেইট অব লিটারেসী হায়ার, সবকিছুই আসতো। কিন্তু আমাদের এখানে লিটারেসী ভেরী লো। নিউজ পেপার ক'জনে পড়ে।
রাজু: আর নিউজ পেপারে যা আসে তাতে কিন্তু হুবহু চেহারাটা আমরা পাচ্ছি না। যা আসে তা খুব সম্পাদিত হয়ে আসে।
ড. হারুন: ইদানীং ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডেও কিছু কিছু ফ্লিকার্স, কিছু কিছু গ্লিম্পসেস, একেবারে একটানাভাবে না, কিছু কিছু জিনিসপত্র দেখানো হয়। আগের মতো ঐ সিক্রেট অবস্থা আর নেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যেটা হয়েছে আমি মনে করি এটি একটা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। আমি ব্যক্তিগতভাবে, এটা পছন্দ করি এ জন্যে যে এটা লোকদিগকে এডুকেট করবে। তারা জানবে যে সিস্টেমটা কী। এটা একটা সুযোগ। সাধারণত জনসাধারণ জানতে পারছে না বুঝতে পারছে না যে পার্লামেন্টে কী হচ্ছে এবং সাংসদরা কী করছে। এই জিনিসটা সামনে নিয়ে আসার জন্যে মাস কমিউনিকেশন–এটা আমি ব্রডার সেন্সে বলছি–তাদের একটা ভূমিকা আছে। পার্লামেন্টটা কী এবং সাংসদরা কী করছে–তারা যদি এটা প্রজেক্ট করে; এর মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট আছে, এর একটা গুণীতক দিক আছে।
রাজু: এদের ভূমিকা অর্থাৎ মাস মিডিয়ার ভূমিকাটা আরেকটু স্পেসিফিকভাবে বলা যায় কিনা? যেমন প্রেস মিডিয়া, এরা তো অনেক আগে থেকেই সংসদ বিষয়ে লেখালেখি করতো, সংসদের টুকিটাকি লিখছে হুইচ ইজ নট সাফেসিয়েন্ট। বিটিভির ভূমিকাটা এখানে কী রকম হওয়া উচিত?
ডঃ হারুন: আমি একটু আগেই বলেছি, বর্তমান সরকার প্রতিবেদন দেয়ার পরিবর্তে সোজাসুজি কী হচ্ছে এটা যে দেখানো হচ্ছে এটা ভালো এই জন্যে যে প্রতিবেদন দেয়ার ভেতর কিছু মুন্সিয়ানা থাকতে পারে, কখনো হয়তো এমন হয় যে শুধু সেই অংশটুকু দিলাম যাতে ওমুক খুশি থাকে। সেটি না দিয়ে জাস্ট যা হচ্ছে সেটা আমি দেখাচ্ছি আনএডিটেড অবস্থায়। সুতরাং সেই ক্ষেত্রে সবাই, অবশ্য যাদের টিভি আছে, আমরা ধরেই নেবো সবাই দেখছেন, না দেখলেও এর যে মাল্টিপ্লায়াব ইফেক্ট, যারা এই কমিউনিকেশনের তাৎপর্যটা বোঝেন তাদের কাছে সংসদের জনপ্রিয়তা বাড়বে, মানুষের কমিটমেন্টও বাড়বে। তারা সেখানে কী করছে, তারা আমার এলাকা সম্পর্কে বলছে কিনা বা প্রধানমন্ত্রী কী বলছেন, আমার বিরোধী দলীয় নেত্রী কী বলছেন, অপজিশন কী বলছে এগুলো যখন পাবলিসাইজড হয় তখন সাংসদরাও এলার্ট হযে যায়।
রাজু: এতে করে সাংসদ অনেক বেশি সতর্ক এবং শীলিত হওযার সুযোগ পাবে।
ডঃ হারুন: এক্সাটলি। এবং তারা এলার্ট থাকবে এবং তাদের এফিসিয়েন্সি আরও বাড়বে। এখন যে জিনিসটা তারা ক্যাজুয়ালি দেখবে, মাস মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের কর্মকা- প্রদর্শিত হলে তখন তারাও সতর্ক হয়ে যাবে।
রাজু: পঞ্চম পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার ভূমিকাকে সংসদীয় রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে কীভাবে দেখবেন বা কিভাবে দেখা উচিত?
ডঃ হারুন: আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। তবে অন দি হোল আমি মনে করি যে অপজিশনের যে ভূমিকা সেটা পালন করতে গিয়ে যে রেসপন্সটা সরকারের পক্ষ থেকে আসা বাঞ্ছনীয় ছিলো তাতে যথেষ্ট ঘাটতি ছিলো। আমি একটু আগেই এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলাম যে অপজিশন এবং সরকার–এই দুটা অফিস পার্লামেন্টারি সিষ্টেমের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একে অন্যের কাছে রেসপন্সিবল এবং রেসপন্সিভ হতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছিলো একটা পর্যায় আওয়ামী লীগ, যেটা শেখ হাসিনা বলেছেন যে আমি এখানে ঠিক আমাদের ভূমিকা পালন করতে পারছি না এই জন্যে যে আমি কোন রেসপন্স পাচ্ছি না। এবং সেখানে একটা ওভারহোয়েলমিং এভিডেন্স রয়ে গেছে রেসপন্স না পাওযার ব্যাপারে। আগেই আমি বলেছিলাম যে সংসদীয গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছে সূর্য, সেই সূর্য পঞ্চম পার্লামেন্টে খুব বেশি উদিত হয়নি। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থাকতেন এবং পার্লামেন্টারি প্রথায় গভর্নমেন্টের দায়বদ্ধতার একটি দিক হচ্ছে কোশ্চেন আওয়ার। প্রশ্ন করার যে সময়টা, দিনের কর্মসূচিতে ঢোকার আগে এক ঘন্টার যে প্রশ্নোত্তরের পালা এটা চিরচরিত। এখানেই একটি দায়বদ্ধতার ব্যাপার। যেমন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সপ্তাহে দুদিন তার প্রশ্নোত্তরের পালা থাকে এবং সেই হাউজ অব কমন্সের গ্যালারী বোঝাই থাকে এবং মেম্বাররাও আসে। এই জন্যে আসে যে আজকে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নের উত্তর দেবেন। দীর্ঘ পাঁচ বছরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটি প্রশ্নের জবাবও উনি ব্যক্তিগতভাবে দেননি।
রাজু: নট এ সিঙ্গেল ওয়ান?
ডঃ হারুন: নো। উনি দেননি। কোন প্রশ্নের জবাব উনি নিজে সরাসরি দেননি। কোন মেজর পলিসির উপর কোন স্টেটমেন্ট উনি দেননি। মাঝে মধ্যে উনি আসছেন হঠাৎ করে কিছু বলতে এবং চলে যেতেন। কারণ উনি তো কেবল সরকার প্রধান না, সংসদেরও তিনি নেত্রী।
জালাল: রাষ্ট্রপতি পদটি লাভজনক পদ কিনা?

ডঃ হারুন: আমাদের সংবিধানে ছেষট্টি দুই-ক অনুচ্ছেদে ঠিক এই মর্মে লেখা আছে যে এই অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির পদ কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবে না। ফর দিস পারপাস অনলি এটা বলা হয়েছে এবং এই ব্যাপারটা সম্পর্কে সম্প্রতি কোর্টে রীটও হয়েছে। স্বভাবতই এটার উপর বেশি কথা বলা ঠিক হবে না। তবে একাডেমিকালি যেটুকু বলা যায় এবং যেটুকু কনস্টিটিউশনে রয়েছে সেটি হচ্ছে সংবিধথান মনে করেছে এটা শুধু রাষ্ট্রপতিই না, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীমহোদয়গণ–এদের কাউকেই অফিস অব প্রফিট বলে গণ্য করা হবে না।
জালাল: অবসরপ্রাপ্ত কোন বিচারপতি কোন লাভজনক পদে নিযোগ লাভে সংবিধানের নিবানব্বই অনুচ্ছেদে বাধা রয়েছে–এই সম্পর্কে বিএনপি পার্লামেন্টে একটি বৈধতার প্রশ্ন এনেছিলো। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
ডঃ হারুন: আক্ষরিক অর্থে যেটুকু বুঝা যায় কারণ এটা তো এখন কোর্টে, এটা নিয়ে এখন বেশি কথা বলাও যাবে না। তবে আমি এইটুকু বলতে পারি যে এটাই সিক্সটি সিক্স টু-এর সঙ্গে, একসঙ্গে পড়তে হবে। যে ধারাটির কথা বলছেন, এটা এবং অনুচ্ছেদ সিক্সটি সিক্স টু-এ, এই ক্লজটা পাশাপাশি পড়লেই দেখা যাবে যে যেহেতু এ রিটায়ার্ড জাজ ওকুপায়িং দ্য পজিশন অব প্রেসিডেন্ট হুইচ ইজ নট রিগার্ডেড বাই দিস ক্লজ এ্যাজ এন অফিস অব প্রফিট। সুতরাং এটা কোন কন্ট্রাডিকশন না আপেক্ষিক দৃষ্টিতে।
জালাল: আপনার কি মনে হয় ন্যায়পাল করা উচিত? হলে তার পদমর্যাদা কেমন হওয়া উচিত?
ডঃ হারুন: 'এম্বুট্সম্যান' শব্দটা, এটা একটা ড্যানিশ শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে অভিভাবক, গার্ডিয়ান এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কান্ট্রিতে এই ন্যায়পালের প্রথাটা বহুদিন থেকে প্রচলিত আছে। এখন অন্যান্য দেশেও এর উপকারিতা স্বীকৃত হচ্ছে, ইংল্যান্ডেও আছে অন্য নামে, যথা পার্লামেন্টারি কমিশনার। এটা হওয়ার প্রধান কারণই হচ্ছে, এক্সিকিউটিভ ক্ষমতা যখনই উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন বুরোক্রেটিক এসসেন্ডেন্সী অর্থাৎ আমরাতন্ত্রের যে প্রাধান্য–সমস্ত দেশেই হোক তা ডেভেলপড বা আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রি–সব জায়গাই সমান। এই যে বুরোক্রেটিক আধিপত্য এবং আধিক্য, এটাকে কন্ট্রোলে আনার জন্যে এই প্রচেষ্টা যাতে এডমিনিস্ট্রেশনে এই ধরনের কোন করাপশন বা দৌরাত্ম না হয়। এখন কথা হচ্ছে আমাদের যেই সিষ্টেমে এটা করা হয়েছে, কনস্টিটিউশনে এটা আছে কিন্তু আজ পর্যন্ত এই পদটি সৃষ্টি হয়নি। একটি আইন করে এর পদমর্যাদা নির্ধারণ করতে হয়। সুতরাং কনস্টিটিউশনে আছে বলেই অম্বুটসম্যান পোস্টটা ক্রিয়েট করে সঙ্গে সঙ্গে একজনকে এপয়েন্টমেন্ট করে দেবো–এটা হয় না। এর টার্মস অব রেফারেন্স, ডেফিনেশন এবং কার্যাবলী, সমস্ত নির্ধারণ করে এটা করতে হবে, সংসদে একটা পূর্ণাঙ্গ বিতর্কের মাধ্যমেই এটা হওয়া উচিত।
জালাল: একজন এক্সপার্ট হিসেবে আপনার কি মনে হয়? এই পদ সৃষ্টি হলে কী কী সুবিধা বা অসুবিধা হতে পারে আমাদের দেশে?
ডঃ হারুন: এই ক্ষেত্রে আমি এক্সপার্ট নই। তবে আমি মনে করি বুরোক্রেটিক এক্সসেসের উপরে হিজ র‌্যাঙ্ক স্যুড বি হায়ার দ্যান এ সেক্রেটারি, সন্দেহ নেই। ফ্রিলি কাজ করার মত তার রিসপনসিবিলিটি এবং পদমর্যাদা থাকলে এবং সিকিউরিটি থাকলে নির্বিঘ্নে তার অর্পিত দায়িত্ব তিনি পালন করতে পারেন।
রাজু: আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আওয়ামী লীগের যে মন্ত্রিসভা রয়েছে তাতে মাইনরিটির কোন অংশগ্রহণ নেই। সুতরাং আমার প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য বললো অথচ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ থাকবে না–ব্যাপারটা আপনার কাছে কেমন মনে হয়?
ডঃ হারুন:আমার ধারণা কেবিনেট এখনও সম্পূর্ণ না। বোধ হয় এটা আর্লি হযে যাবে এ সম্পর্কে কিছু বলা। বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী, ইংল্যান্ডের ডিজরেইলী বলেছিলেন যে ইটস এ গ্রেট টাইম গ্রেট লেবার, গ্রেট রিসপনসিবিলিটি তার কারণ এই কেবিনেটটা করতে গিয়ে যে বিভিন্ন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে সেটি হচ্ছে আঞ্চলিক, মেধা, সিনয়রিটি, ব্যাকবেঞ্চার বিভিন্ন সোসিও ইকোনোমিক ফোর্সেস–এগুলোর সমন্বয় করে একটা কেবিনেট করা ইটস এ রিয়েলি এ গ্রেট টাস্ক। সুতরাং আমার মনে হয় এখনও এটা, কমপ্লিট হয়নি। আমার মনে হয় বাই ইলেকশনের পরে এটা সম্পূর্ণ হবে। এবং তখন যদি এর রিপ্রেজেন্টেশন না থাকে তখন বোধ হয় আমরা কিছু বলতে পারি।
রাজু: আরেকটা প্রশ্ন, আদিবাসীদের সাথে আমাদের একটা কনফ্রন্টেশন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা তাদেরকে বাংলাদেশী বলছি অথচ তাদের সাথে আবার এক ধরনের লড়াই চলছে–এটা আসলে কী কারণে হচ্ছে বা এটা আমরা কীভাবে সলভ করতে পারি?
ডঃ হারুন:আমরা নিজেরা যদি পার্বত্য এলাকার লোকদের সমস্যা না বুঝি তাদেরই একজন হয়ে, তাহলে তাদের প্রবলেমটা সলভ করতে পারবো না। আমরা পাকিস্তান আমলে নেগলেক্টেড–অবহেলিত ছিলাম। আমরা সংগ্রাম করে দেশটাকে স্বাধীন করেছি, ঠিক একই কারণে এই পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতি যারা রয়েছে তারাও মনে করতে পারে যে এখানে ওভারহোয়েলমিং মেজরিটি অর্থাৎ বেঙ্গলি তারা তাদের সমস্ত কিছু আচার আচরণ, কৃষ্টি-সংস্কৃতি আমাদের উপর চাপিয়ে দেবে, আমাদের স্বকীয়তা থাকছে না, তাদের এই যে স্বকীয়তা থাকছে না–এই অনুভূতিটা যাতে না হয়। আমার যতদূর ধারণা এবং যতদূর বুঝতে চেষ্টা করেছি, ওরাতো টোটাল ইন্ডিপেন্ডেন্স চাচ্ছে না, তারা বাংলাদেশের ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে থেকেই তাদের নিজেদের উপজাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে তারা কো-এগজিষ্ট করতে চায়। এর সলিউশনটা রাজনৈতিকভাবেই হওয়া উচিত। সামরিকভাবে নয়। সামরিক সলিউশন কোন সময় হবে না। যেমনটি হয়নি পাকিস্তানের ইস্যু, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের উপজাতীয় ব্যাপারেও এইটা কোনভাবেই মিলিটারি সলিউশন হবে না।
এইটা একদম রিভার্স করতে হবে। এর একেবারে উল্টা। যার কারণে ওখানে স্থানীয়ভাবে তারেদকে দায়িত্ব দিতে হবে। মোট কথা হলো আস্থা যাতে ফিরে পায়, এটা যে তাদেরই বাসভূমি–এই অনুভূতি তাদেরকে দিতে হবে।
রাজু: ইনডেমনিটি বিল বাতিল করার জন্য, বলা হচ্ছে টু থার্ড মেজরিটি লাগে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
ডঃ হারুন: আমি তো লিগাল এক্সপার্ট না। আমি যেটা প্রথমেই মনে করি এটা একটা আনসিভিলাইজড ল। যেটা আমাদের কনস্টিটিউশনে আছে। পলিটিক্যাল এসাসিনেশন বহু জায়গায়ই হয়। কিন্তু খুনিদের মাফ করে দিয়ে এইরকম একটি আইন সভ্য জগতের একটি সংবিধানে থাকবে–আমরা কি তবে অন্ধকার যুগে চলে গেছি?
রাজু: আচ্ছা, এটা কি সিম্পল মেজরিটি দিয়েই বাতিল করা সম্ভব?
ডঃ হারুন: ভালো ভালো আইনজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, যেমন জাস্টিস কামারুদ্দিন সাহেব, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম তাঁদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। তাঁরা এই ধারণাটা দিয়েছেন যে এটা সিম্পল মেজরিটিতেই সম্ভবপর, তাঁরা ফোর্থ সিডিউলের কথা উল্লেখ করলেন, সেখানে এই ধরনের ইঙ্গিত রয়ে গেছে সিম্পল মেজরিটি সম্পর্কে। এখন এটা সম্ভব কি অসম্ভব এটা উত্থাপিত হলে বুঝা যাবে।
রাজু: যেটা সিম্পল মেজরিটিতে হতে পারে যেটা আপনি বললেন, এবং মেনন সাহেবও আমাদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে এ কথাই বলেছেন। যদি তাই হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটা নিশ্চয়ই জানবেন?
ডঃ হারুন: নিশ্চয়ই জানবেন তিনি। মেনন সাহেব এখন বলছেন এ কথা, কিন্তু যখন তিনি অপজিশনে ছিলেন তখন তো তিনি ওখানে থেকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে পারতেন। ওইভাবে তো সোচ্চার উনি হননি।
রাজু: নতুন সরকারের আমলে কেমন বোধ করছেন? এদের সম্পর্কে আপনার কী প্রতিক্রিয়া ?
ডঃ হারুন: এইটুকু বলা যায়, এবং আস্থা নিয়েই বলা যায়, বলে না যে মর্নিং সোজ দ্য ডে। আওয়ামী লীগ যেভাবে শুরু করেছে তাতে করে, এমনকি যারা আওয়ামী লীগ করে না, তারাও আভাসে ইঙ্গিতে তাদের স্টাইলটা এপ্রিশিয়েট করছে। আরেকটি কথা হচ্ছে আওয়ামী লীগ, ওয়ান অব দ্য ওলডেষ্ট পলিটিক্যাল পার্টিজ। ইটস এ নেচারাল পলিটিক্যাল পার্টি। নেচারাল বলছি এই জন্য যে এর জন্ম হয়েছে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সংক্ষেপে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংগ্রাম আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষা, বিরোধী অবস্থানে থাকার অভিজ্ঞতা ও দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা থেকে এটা আশা করা, বোধ হয় অতিরঞ্জিত হবে না যে আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
জালাল: জাতীয় ঐকমত্যের সরকার এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত সরকার। আমরা কি বর্তমান গভর্নমেন্টকে ঐকমত্যের সরকার বলবো?
ডঃ হারুন: আক্ষরিক অর্থে না। এখানে এই জিনিসটা আমি যেটা বলবো এটা একটি সিমান্টিকের সমস্যা। যে কোন ভাষা বা শব্দ রিয়ালিটিকে সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করতে পারে না। সুতরাং যখন আমি ঐকমত্যের সরকার বলি এর অর্থ এই না যে এই ঐকমত্য অনড় মতবাদ নয়। অর্থাৎ বারো কোটি লোক একমত হয়ে দেশ পরিচালনা করছে–ব্যাপারটা এমন নয়। এটা এই কনসেপ্টে নিহিত না। কারণ আমি যদি ইংরেজি অনুবাদ করি শব্দটার, কনসেনশাস-এর অর্থ হচ্ছে মেজরিটি অব ওপেনিয়ন অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ কী মনে করে। আমি সেই অর্থে এটি দেখছি। আরেকটি হচ্ছে যে কোন সরকার, যে কোন দেশে এটা শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষিত না, যে কোন দেশই হোক না কেন, তার একটা নিজস্ব ধরন থাকবে। যেমন খালেদা জিয়ার সময একটা কথা ছিলো যে ডাল-ভাত বা দুধ-ভাত। এর আগে যেটা ছিলো উৎপাদনের রাজনীতি, এটা একটা স্টাইল, এটা একটা একসেন্ট, এক একটা পার্টি ইন পাওয়ার তার ধুয়া থাকে। ঠিক এই সরকারেই এই ধরনের একটা এমফেসিস হচ্ছে তারা যা কিছুই করবে মেইন এমফেসিস হচ্ছে একটা কনসেনশাসের উপর। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের এটা মতামত। আমার মনে হয় আক্ষরিক অর্থে এটা আওযামী লীগ সরকার মনে করছে না যে বারো কোটি লোক, তারা সবাই এক হয়ে গেছে। এরা সবাই একটা স্ট্রেইট জ্যাকেটের মধ্যে আছে–তা না। ভিন্নমত আছে, কিন্তু কতগুলো মৌলিক বিষয় আছে যেগুলো সম্পর্কে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। এটা তো ঠিকই কোন রাষ্ট্র হাওয়ায় চলতে পারে না, তার কতগুলো মৌলিক মূল্যবোধ থাকবে যার উপর তাদের মূল ভিত্তি বা নোঙ্গর থাকবে। এর থেকে তারা সরবে না। যেমন এনটায়ার ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে আমরা যদি দেখি, দেখবো কমবেশি তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির আওতার মধ্যে রয়েছে। ঠিক তেমনি রাজনীতির ব্যাপারে তাদের গণতন্ত্রের ধারা বিদ্যমান এবং কালচারের ব্যাপারটা আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানে জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান কারচারের মধ্যেই তারা বিধৌত। সুতরাং এগুলো হচ্ছে তাঁদের মৌলিক ব্যাপার। ঠিক সেই অর্থেই আওয়ামী লীগ মনে করছে, আমাদের কিছু মৌলিক সমস্যা বা, মৌলিক বিশ্বাস ও মৌলিক মূল্যবোধ আছে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এটা কি একটা মৌলিক ব্যাপার না? এটার সঙ্গে কি আমাদের বারো কোটি মানুষের দ্বিমত থাকতে পারে? ঠিক তেমনি আমাদের যে মৌলিক ও প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো, আমাদের যে চাহিদা, সে কথা বার বার বলছে। বিশেষ বিশেষ যে সমস্যাগুলো আছে সেখানে তো সবারই ঐকমত্য হওয়া দরকার। এই প্রেক্ষিতে আমি মনে করি যে এই সরকার হচ্ছে ঐকমত্যের সরকার। কথা হচ্ছে যে কোন সংবিধানে এটা লেখা থাকে না যে ওটা কি কোয়ালিশন সরকার হবে না ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট হবে। কোন দেশের সংবিধানে এটা লেখা থাকে না। যেটা থাকে তা হলো পার্লামেন্টারি সিস্টেম অব গভর্নমেন্ট যে পার্টি হ্যাভিং দ্য মেজরিটি ইন দ্য পার্লামেন্ট, হ্যাভিং দ্য কনফিডেন্স অব দ্য মেজরিটি অব দ্য মেম্বার্স ইনসাইড দ্য পার্লামেন্ট উইল ফর্ম দ্য গভর্নমেন্ট এবং এবসুলিউট মেজরিটি না থাকলে তারা জোড়াতালি দেবে। এবং জোড়াতালি দিতে গেলেই হর্স ট্রেডিং হয়। হর্স ট্রেডিং শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা না। কমবেশি পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় হর্স ট্রেডিং আছে। কেউ ভদ্রভাবে করে, কেউ হয়তো সামান্য অপ্রচলিতভাবে করে এবং সে ক্ষেত্রে নানা ধরনের গভর্নমেন্ট করে, ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট হতে পারে, মাইনরিটি গভর্নমেন্ট হতে পারে, ক্যাবিনেট অব টেলেন্ট হতে পারে। ইংল্যান্ডে যেমন হয়েছে ক্যাবিনেট অব পারসোনালিটি–১৯৩১ সালে হয়েছে। আবার ন্যাশনাল গভর্নমেন্টÑসুতরাং এগুলো হচ্ছে এক একটা নাম। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে যে নামে সরকারটা হয়েছে সেই সরকারটা পার্লামেন্টে কনফিডেন্স আছে কিনা। কোন সংবিধানে লেখা নেই ঐকমত্যের সরকার। এটা হচ্ছে ধরন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক