শওকত ওসমানের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার: আমেরিকান-রাশিয়ানরা যখন চাঁদে পেশাব করে তখন আমি রিকশা টানি

admin
Published : 19 August 2019, 04:43 PM
Updated : 19 August 2019, 04:43 PM


খুব সম্ভবত আমরা শওকত ভাইয়ের তখনকার মোমেনবাগের বাসভবনে গিয়েছিলাম সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য। সেটা ১৯৯৫ সালের জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। যাওয়ার আগে তার সাথে দিনক্ষণ আগেই নির্ধারিত করা হয়েছিল ফোনে। কবি ব্রাত্য রাইসু ও আমি তখন কাজ করি অধুনাবিলুপ্ত বাংলাবাজার পত্রিকায়। আমরা সবেমাত্র সাক্ষাৎকার বিভাগের দায়িত্ব পেয়ে কাজ শুরু করেছি। শওকত ওসমানের এই সাক্ষাৎকারটি সেই প্রথমদিকার একটি। এটি এখনও পর্যন্ত গ্রন্থভুক্ত হয়নি। সাক্ষাৎকারটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে বিডিআর্টস-এ পুনর্মুদ্রণ করা হলো।–রাজু আলাউদ্দিন

সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন :রাজু আলাউদ্দিন ও ব্রাত্য রাইসু

রাইসু : ভালো আছেন কি?
শওকত : ওটা (টেপরেকর্ডার) অন করেছো?
রাজু : কেন, অস্বস্তি বোধ করছেন?
শওকত : না না আমি করছি না। ভালো আছি। আর এসব করতে হলে আগে থেকে ঠিক করে রাখতে হবে যে আমি এসব এসব চাই। হঠাৎ বলো না কী তোমার জিজ্ঞাস্য?
রাইসু : নির্দিষ্ট জিজ্ঞাস্য কিছু না, আপনার সাথে কথা বললাম, এই আর কি।
শওকত : এটা মিনিংলেস হয়ে যায় তো অনেক সময়। তোমাদের উদ্দেশ্য যদি না থাকে তা অনেকক্ষণ ধরে কথা বললাম মানে কী? আমিই বা কী কথা বলবো?
রাইসু : আমরা চাইছি আপনাকেই ধরতে। আপনার কোনো বিশেষ ব্যাপারে আপনার কোনো উত্তর আমরা আশা করছি না। আপনার কথা বলার মাধ্যমে আপনি চলে আসলেন–এই আর কি।
রাজু : না, ওসমান ভাই যেটা বললেন, উদ্দেশ্যটা বড়ো ব্যাপার বটে…
শওকত : পরিচয়টা তো দিতে হবে। তোমরা নাগরিক হচ্ছো…বলো কী নামটা?
রাজু : আমার নাম রাজু আলাউদ্দিন।
শওকত : আরে ভাই, তুমি খুব চেনাশোনা লোক। এটা আগে বলবে তো। তিনশো বছর হয়েছে তো একেবারে গ্রাম্যতা যায় নি।
রাইসু : আমাদের?
শওকত : মানে কলকাতা শহরের। এটা তো গ্রাম থেকে এইমাত্র একটু…
রাইসু : আপনি গ্রাম্যতার বিরুদ্ধে?
শওকত : গ্রাম্যতা মানে কী, সমাজের তো কতোগুলো নর্ম হয়ে যায়। গ্রাম্যতা বলতে গ্রামের বিরুদ্ধে কিছু বলা হচ্ছে না। তার আউটলুকের ওপর বলা হচ্ছে। যে জন্যে চাঁদে গিয়ে, এটা তো অনেকবার বলেছি, আমেরিকান-রাশিয়ানরা যখন চাঁদে পেশাব করে তখন আমি রিকশা টানি। আর কিছু নৈতিক কোশ্চেনও আছে। এটা তো আসলে জিজ্ঞাসারই ব্যাপার নেই আর। ঐ যে দেখেছো টেপরেকর্ডারটা, ওটা কি খালি একটা জিনিসই? জাস্ট এ থিং?
রাইসু : না এটার কাজও আছে।
শওকত : এটা ঐ হয়ে গেল। বলো, এটা কী বলো?
রাইসু : এটা একটা শব্দগ্রাহক যন্ত্র।
শওকত : এর কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নেই?
রাইসু : না, তাতো আছেই।
শওকত : তা কী, ব্যাকগ্রাউন্ড মানে কী?
রাইসু : ব্যাকগ্রাউন্ড মানে এটা কিভাবে তৈরী হলো, এটার ইতিহাস।
শওকত : ইতিহাস, হ্যাঁ। ইতিহাসেরও ইতিহাস। একটা জিনিস এমনিই এসে যায় নাকি? এই যে চাঁদে যায় এমনিই চলে গেছে মানে, কী বলবো, এই যে দাদার দাদা আছে এটাই তো ভুলে যায়। আমাকে এখন আর উত্তেজিত কোরো না, ডাক্তার মানা করে দিয়েছে। হিউম্যান স্টুপিডিটি দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। যা ঘটে আর কি এখানে, ওগুলো নিয়ে তো কেউ প্রশ্নও তোলে না। একটা থিং নিজে থিং না তো। বহুকালের সুদীর্ঘকালের সাধনা তারপর একটা জিনিস আসে। গ্রাম্যতা কী, তুমি একটা জিনিস ব্যবহার করছো কিন্তু জানো না। আমরা ইতিহাস দিয়ে বেষ্টিত নই? তোমার তো কনট্রিবিউশনই নেই গত সাতশো-আটশো বছরে। কিছুই নেই তোমার। আর ঐ ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে–আমি এই আছিলাম ঐ আছিলাম ।
রাজু : আচ্ছা ওসমান ভাই, আপনি যে বললেন সাতশো-আটশো বছরে আমাদের কোনো কন্ট্রিবিউশন নেই, তাহলে তো মুসলমানদের সাতশো আটশ বছরের অতীত ব্লাঙ্ক। ভবিষ্যতে তাহলে কী হবে?
শওকত : ইতিহাসে তো আর রেডিমেড কিছু পাওয়া যায় না।
রাইসু : ওসমান ভাই, যদি আপনি বলেন মুসলমানদের সাতশো-আটশো বছরের অতীত ব্লাঙ্ক তাহলে তো জাতি হিসেবে একটা শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন এসে যায়। মানে যারা জাতি হিসেবে ভালো কাজ করেছে তাদের আমরা শ্রেষ্ঠ জাতি বলবো?
শওকত : হ্যাঁ, সেই।
রাইসু : এটি বলার মাধ্যমে আমরা সম্প্রদায়িক কোনো কাজ করছি কিনা? জার্মানরা যে নিজেদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলতো…?
শওকত : না, সেটা থাকলেও ইতিহাসের কতোগুলো ডিমান্ড আছে। সে ডিমান্ডর সাথে…….
রাইসু : ডিমান্ড ফুলফিল করতে পারবে কিনা সেটা তো অনেকটাই পরিবেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। মরুভূমিতে তো জাহাজ আবিষ্কার করা সম্ভব নয়।
শওকত : সেটাই সব নয়। পরিবেশ তো আছেই। পরিবেশের কনট্রিবিউশন নিশ্চয়ই থাকে। তবু আবার মানুষ।
রাইসু : টেকনোলজিক্যাল উন্নতিই কি সমস্ত উন্নতির স্মারক?
শওকত : টেকনোলজি ওয়ান অব দি ফ্যাক্টরস। সভ্যতার একটা বিশেষ ফ্যাক্টর।
রাইসু : টেকনোলজি ছাড়াই তো আদিবাসীরা বেঁচে আছে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান আমাদের চেয়ে খারাপ আমরা বলতে পারি না।
শওকত : বাঁচে তো এ জন্যে চল্লিশ বছর। কনট্রিবিউশনও তে কিছু নাই। তার শিল্প সাতিত্যের পারষ্পর্য….
রাজু : আপনি লিনিয়ার ভাবে ইতিহাসকে দেখছেন বলে এটা বলছেন। কিন্তু ওরা তো হিস্ট্রির বাইরে। ইতিহাস যে লিনিয়ার এই ধারণাটাই তো ওরা গ্রহণ করছে না।
শওকত : আমি বলছি যে, আদিবাসীরা তো সিভিলাইজডই হয়নি। আমরা যাকে সিভিলাইজেশন বলি আর কি, যেমন তার জ্ঞান বিজ্ঞান শিল্প সাহিত্য– এগুলো হয়তো প্রিমিটিভ স্তরে থাকে ওদের।
রাজু : কিন্তু এখন তো এটা সম্পর্কে একটু বিতর্ক বা ভিন্নমত আছে।
শওকত : কারা করে জানো, যারা এগিয়ে গেছে। মধ্যযুগীয়তা ভাঙবার জন্যে ন্যাশনালিজম একটা বিরাট ফ্যাক্টর। অথচ তারাই আমাদের বলবে তোমরা ন্যাশনালিস্ট হয়ো না।
রাজু : ঠিক আছে, আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্তু আদিবাসীদের ওপর যে গবেষণাগুলো আলোচনাগুলো, ওরা দেখাতে চাচ্ছেন যে আমরা যেভাবে স্টেটের কল্পনা করি এরকম একটা কাঠামো ওদের মধ্যেও থাকে। ওদেরও তো একটা সোশ্যাল টাইপ আছে।
শওকত : ওরে ভাই, সেটা আছে, যেখানে হিউম্যান সিভিলাইজেশন এত অগ্রসর হয়ে গেছে…
রাজু : আপনি সিভিলাইজেশনকে দেখতে চাচ্ছেন টেকনোলজিক্যাল উন্নতি দিয়ে?
শওকত : টেকনোলজি ওয়ান অব দি ফ্যাক্টরস, শুধু টেকনোলজি হলে তো হবে না।
রাজু : এখন আমি যদি বলি আমার টেকনোলজি আদৌ দরকার আছে কিনা?
শওকত : হতে পারে। হলে ঠিক আছে। সুইসাইডাল ম্যানিয়াও তো থাকে অনেক জাতের। যাদের বিজ্ঞানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। সোজা বলা যায় নিশিগ্রস্ত জাত।
রাইসু : আমরা সাহিত্যের মধ্যে আসি।
রাজু : সাহিত্যের দিক থেকে আপনি বাঙালি মুসলমানদের কোনো কনট্রিবিউশন দেখতে পান, সিগনিফিকেট বা টাওয়ারিং কাউকে?
শওকত : টাওয়ারিং কোনো কিছু হয়তো হয়নি।
রাজু : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা আপনার কথা বলা যায়।
শওকত : আজকাল ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে বুজতে হয়। আমরা তো লোকাল লায়ন হয়ে যাই–স্থানীয় সিংহ আর কি।
রাইসু : ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড তো একটা রাজনীতিক ব্যাপার। ভালো হলেই ওরা বুঝবে কেন, স্বীকার করবে কেন? আমরা তো আর ইংরেজিতে লিখি নাই।
শওকত : ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড মানে কী, তুমি নিজেই বুঝে যাবে। আমার ডাইরিতেই তার প্রমাণ আছে, বুঝেছো। নাইনটিন সেভেনটি সেভেনে, প্রথম যখন হানড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড পড়লাম, বললাম যে একে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত। আরো আট বছর লাগলো, দেরি হলো। মানে আরো সাত বছর পরে পেলো আর কি। সেই যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার তৈরি করে, সাংঘাতিক ক্ষমতা আছে।
রাজু : বোর্হেস-এর লেখাও বোধহয় আপনি সে সময় পড়েছেন।
শওকত : লোকটা পলিটিক্যালি কিন্তু ফ্যাসিস্ট।
রাজু : ফ্যাসিস্ট হলে সাহিত্যিকর্মে কী কী সমস্যা হতে পারে?
শওকত : ফ্যাসিস্ট হলেও সে কিন্তু সাহিত্যিক বড়ো হতে পারে। এই পাউন্ড-টাউন্ড আছে। সামাজিক সমস্যা হবে কিন্তু নন্দনতাত্ত্বিক সমস্যা হচ্ছে না।
রাইসু : নন্দনতত্ত্ব তাহলে কি মোটামুটি অমানবিক একটা জিনিস?
শওকত : অমানবিক না।
রাজু : আমাদের এখানে কি এরকম কোনে নজির আছে যে বড়ো লেখক, রাজনীতিক আদর্শের জন্যে…
শওকত : আমি এতে দুঃখ পাই আর কি। আমি বলি যে কার্সড রাইটার–অভিশপ্ত লেখক। আমি সচেতন হই বা না হই, আমরা যারা এ অবস্থায় আছি–আমি তো কাজ করি এথিকসের জন্যে। রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথকে কী করতে হয়েছে, কতো সামাজিক কাজকর্ম করতে হয়েছে। বাঘাবাড়িতে গেলে, পাবনাতে আর কি, সেখানে যে-গরুগুলো আছে-অনেকে ঠাট্রা করে বলে রবীন্দ্রনাথের বংশধর।
রাইসু : আমার মনে হয় যদি কেউ ফ্যাসিস্ট হয় অসুবিধা নেই, কিন্তু যদি সাহিত্যের মধ্যে ফ্যাসিজম থাকে তাহলে সমস্যার ব্যাপার।
রাজু : আচ্ছা, আমাদের এখানে যেটা দেখা গেলো যে 'মার্কসবাদী'–এরকম লেবেল মার্কা সাহিত্যের একটা ব্যাপার যে শুরু হয়েছিলো এটা কি স্বাভাবিক ছিলো?
শওকত : যে-অবস্থায় কাজ করি, যে অবস্থার মধ্যে থাকি সমাজের কথাটাই প্রথম কথা আমরা যে দেশে বাস করি।
রাজু : তাহলে তো এদেশে বড়ো শিল্পী হওয়া সম্ভব নয় কখনো।
শওকত : এখন নেইও তো। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভা, কিন্তু সারাজীবন লিরিকের ওপর কাজ করে গেলেন। আরো তো আছে সাহিত্যের।ইউরোপ থেকে আনলেন রোমান্টিক মুভমেন্টটা। ওখানে তো আরো মুভমেন্ট ছিল। যারা মননের ওপর কাজ করেছেন। তাহলে কি আর আমরা এই অবস্থায় থাকি। কুত্তার মতো ঝগড়া মারামারি করি।
রাইসু : এত মননশীলতার চর্চার পরও কি ইউরোপে সাম্প্রদায়িক ঝগড়াঝাটি হয় না?
শওকত : আমাদের মতো হয় না।
রাজু : বসনিয়ায় যেভাবে হচ্ছে।
শওকত : রাজনীতির অন্যান্য কন্ডিশনও তো আছে।
রাইসু : এসব থেকে তো মনে হয় সাহিত্য বা শিল্প মানুষের মননের উন্নতির জন্যে কিছুই করতে পারে না।
শওকত : করতে পারে। রবীন্দ্রনাথই এটা দেখিয়ে গেছেন। লিরিকের হাইয়েস্ট ফর্ম মিউজিক। আমাদের দুজন (আরেকজন নজরুল) যারা গ্রেট–দুজনেই এটা দেখিয়ে গেছেন। আর মিউজিক তো মননেরই জিনিস।
রাইসু : আচ্ছা, আমরা যে এখনও আমাদের সাহিত্যে ভারতীয় দাদাদের ছাপ পাই……
শওকত : ছাপ পাই মানে কী? হঠাৎ হঠাৎ তো আর কেউ দ্রুত দিগদিগন্ত খুলে রবীন্দ্রনাথের মতো ভেঙেচুরে এটা-ওটা করতে পারে না। আর যেহেতু সাহিত্যের উৎসটাও ছিলো ওইখানে। মানে মডার্ন সাহিত্যের ব্যাপারটাই কলকাতাকেন্দ্রিক। সব ওখানেই। সব জায়গাতেই তাই। ইউরোপে অবশ্য আর অতোটা নেই যে প্যারিসে না গেলে হবে না।
রাইসু : এটা এখনও কাটছে না কেন, কলকাতার যে হ্যাংওভার।
শওকত : আইডোলজিক্যালি যদি জোরদার কোনো কিছু এখানে গ্রো করতো তাহলে এটা কেটে যেতো তাড়াতাড়ি। মুক্তি কি এতই সহজ ভাই? ঐ সোশ্যাল ইভলুশনটা কক্ষনোই তো হয় নাই।
০৪/০১/১৯৯৫

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক