আনহেলেস মাস্ত্রেত্তা’র জীবন আমার উপড়ে নাও – তৃতীয় পর্ব

আনিসুজ জামান
Published : 6 June 2022, 04:58 PM
Updated : 6 June 2022, 04:58 PM


লেখিকার ছবি: পাস্কুয়াল বোসেইয়্যি ইগলেসিয়াস
আনহেলেস মাস্ত্রেত্তা (জ. ১৯৫৯) সমকালিন বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক। তাঁকে লাতিন আমেরিকার বুম-পরবর্তী সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি একইসঙ্গে সাংবাদিক, অভিনেত্রী ও প্রযোজক। নারীচরিত্রপ্রধান রাজনৈতিক উপন্যাস রচনার জন্য বিখ্যাত। তাঁর সাহিত্যে নারী চরিত্ররা ভীষণ সাহসী, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারা আত্মপরিচয় নির্মাণে যথেষ্ট সচেতন।

আনহেলেস মাস্ত্রেত্তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো উপন্যাসের নাম Arráncame la vida, যেটি Tear This Heart Out শিরোনামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে উপন্যাসটি অবলম্বনে সিনেমা নির্মিত হয়। মেক্সিকান রেভ্যুলেশনের সময় এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে রোম্যান্টির-রাজনৈতিক ধারার এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। সে বছর বইটি মেক্সিকোতে "বেস্ট বুক অব দ্য ইয়ার" পুরস্কার জেতে। এই উপন্যাসে মাস্ত্রেত্তা খোলাখুলিভাবে যৌনতার অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটি প্রধান নারীচরিত্র কাতালিনার বয়ানে রচিত। মেক্সিকান জেনারেল মাক্সিমিলিয়ানো আবিলা কামাচোর জীবনীর ছায়া অবলম্বনে লেখা। দুর্নীতিবাজ, হিংস্র ও নারীভোগী রাজনীতিবিদ তিনি। তার অসম-বয়সী স্ত্রী হয়ে কাতালিনা দৃঢ়তার সঙ্গে ন্যারেটরের ভূমিকা পালন করেছেন। উপন্যাসটি পাঠ করে প্রকৃত মেক্সিকো, মেক্সিকোর রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতা সম্পর্কে পাঠক ধারণা পাবেন।

উপন্যাসটি অনুবাদের স্বত্ত্ব নিয়ে স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন অনুবাদক আনিসুজ জামান। তিনি এরই মধ্যে গাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেসের পৃথিবীখ্যাত উপন্যাস নিঃসঙ্গতার একশ বছর এবং ওনেত্তির উপন্যাস কুয়া অনুবাদ করেছেন। সম্প্রতি তাঁর অনুবাদে আরো প্রকাশিত হয়েছে সমকালিন কলোম্বিয় ছোটোগল্পের সংকলন গাবোর দেশে গাবোর পরে
আজ প্রকাশিত হলো উপন্যাসটি তৃতীয় পর্ব।

মূল থেকে অনুবাদ: আনিসুজ জামান

মুন্ঞস বোনদের সাথে প্রায় এক সপ্তাহ পরে এক বন্ধুকে আমন্ত্রণ জানাই আমার তৈরি মেগানোসের স্বাদ গ্রহণ করার জন্য। আমরা কফি পান করছিলাম, তখন একদল সৈনিক হত্যার অভিযোগে গভর্নর দ্বারা স্বাক্ষরিত আন্দ্রেসের গ্রেপ্তারের পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়।
আন্দ্রেস কোনো উচ্চাবাচ্য না করেই ওটা পড়ে। আমি কাঁদতে শুরু করি।
তোমাকে কেন নেবে? কোথায় নিয়ে যাবে? তুমি কাউকে হত্যা করোনি, তাই না?
চিন্তা করো না কাতালিনা, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসছি, বলে বন্ধুকে আমার সাথী হতে বোলে। আমি এর ব্যাখ্যা চাইতে যাব। কোথাও নিশ্চয়ই ভুল হচ্ছে।
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ওদের সাথে চলে যায়।
দরজা বন্ধ করে আবার কাঁদতে শুরু করি। তাদের নিয়ে যাওয়াটা মুখে লাথি মারার চেয়েও অপমানজনক ছিল। কীভাবে আমার বন্ধুদের সামনে মুখ দেখাব? মা-বাবাকে কি বলবো? কার সাথে ঘুমাবো? কে আমাকে সকালে ঘুম থেকে জাগাবে?

সান্তিয়াগোর গির্জায় ছুটে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার কথা ভাবতে পারি না। কেউ আমাকে বলেছিল সেখানে নতুন এক কুমারি মাতা এসেছে যে অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। আমি যে সমস্ত প্রথম শুক্রবার ও মাসে অনুপস্তিত থেকেছি তার জন্য অনুতপ্ত হই।
সান্তিয়াগো গির্জাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, বেদী সোনালী উজ্জ্বল, ওখানে উঁচুতে এক কুমারির প্রতিকৃতি একটি শিশুর হৃদপিণ্ড ছুঁয়ে ছিল।

ছয়টার সময় জপমালা দিয়ে বন্দনা করা হতো। আমি সামনে হাঁটু গেড়ে বসি যাতে কুমারি মাতা আমাকে আরও ভালভাবে দেখতে পান। গির্জাভর্তি মানুষ দেখে ভয়ও হচ্ছিল আমার বিষয়টা অন্যদের বিষয়ের মধ্যে হারিয়ে না যায়। ঠিক ছটায় ফাদার বিশাল জপমালা হাতে নিয়ে বেদীর সামনে আসেন। বয়সে তরুণ, বড় বড় চোখ, মাথার চুল কমতে শুরু করেছে। তার কণ্ঠস্বর এত বলিষ্ঠ যে গির্জাজুড়ে গমগম করছিল।
আজ আমরা আনন্দময় অলৌকিক ঘটনাগুলোর বন্দনা করব। প্রথমটি হচ্ছে, যিশুখ্রিস্টের জন্মের ঘোষণা। হে পবিত্র স্বর্গের পিতা…বলে তিনি আরম্ভ করলেন।
আমাদের পিতা, আবে মারিয়ার প্রার্থনাগুলোর জবাব এমন উৎসাহের সাথে দিচ্ছিলাম যে সন্যাসিনীদের স্কুলেও তা কখনও অনুভব করিনি। ভেতর থেকে চাচ্ছিলাম, কুমারি মাতা, ওকে দেখে রেখো, আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।
প্রতিটি বন্দনার শেষে অরগান থেকে বাজছিল যে গানের সুর তা সকলেরই জানা ছিল। ফাদার প্রথমে শুরু করলে অন্যরা দোহার ধরছিল।

গান শেষ হলে সাহায্যকারী ছেলেটি ধুপদানীতে ধূপ ধরিয়ে দিলে ফাদার তা হাতে নিয়ে কুমারি মাতার দিকে আগপিছু দোলাচ্ছিলেন। বেদী এবং গির্জা রূপালি ধোঁয়ায় ভরে ওঠে।

"আওয়ার লেডি অফ দ্য সাক্রেড হার্ট, তোমার কাছে অনুনয় করছি, অনুনয় করছি," সবাই গেয়ে ওঠে। গির্জার মাঝের রাস্তাটিতে বেশ কয়েকজন মহিলা সোজা হয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে হাত দিয়ে ক্রুশ বানিয়ে বেদির দিকে এগিয়ে আসে। ওদের মধ্যে দু'জন কাঁদছিল।
মনে হলো আমারও ওদের সঙ্গে থাকা উচিত, কিন্তু আমার লজ্জা পায়। ওদের সঙ্গে থাকার উপর যদি আন্দ্রেসের মুক্তি নির্ভর করে তাহলে সে কখনই ফিরবে না।

অন্যরা যখন বার বার কুমারি মাতার পবিত্র হৃদয় উচ্চারণ করছিল ওই মহিলারা তখন বেদির দিকে আগাচ্ছিল।
দ্রুত আমার চাওয়াগুলো আউড়ে যাই। আমাদের ও নিজের মুকুটের মালিক শান্ত কুমারি মাতার দিকে নীচ থেকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে খুব নীচু স্বরে আমি সেগুলি উচ্চারণ করি।

কিন্তু সে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল না, চোখের পাতা এঁটে এসেছিল। তার বয়স বাড়ে না, আমাদের নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তাও নাই।
হঠাৎ বাদ্য থেমে যায় এবং পাদ্রি তার হাত ছড়িয়ে দিয়ে ক্রুশ তৈরি করে বলেন, "পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী কুমারি মাতা, আপনার ঐশ্বরিক পুত্র আপনাকে তার মূল্যবান হৃদয় থেকে ক্ষমতা ও শক্তি দিয়েছেন। হে যীশুর মহান হৃদয়ের স্বর্গীয় অভিভাবক, আপনার হৃদয় বিশ্বাসে পরিপূর্ণ, আমাদের সুরক্ষার জন্য আপনার কাছে এসেছি!" দোয়ার বাকি অংশটা আমার ঠিক মনে নেই, কিন্তু কোন জায়গায় ঈশ্বরের কাছে চাইতে হবে তা ঠিকই জানা ছিল।

এরপর বিশাল এক ফিসফিস শোনা গেল গির্জাজুড়ে। সবদিক থেকে ভেসে আসতে লাগল। আমিও ফিসফিস করে বলি, আন্দ্রেসকে ফিরিয়ে আনো, ওকে যেন ওরা জেলে না নেয়, আমাকে নিঃসঙ্গ করো না।
না, আমরা খালি হাতে যাব না, শোনা গেল সমবেত কণ্ঠ। তখন দুই হাত দিয়ে ক্রুশ বানালেন ফাদার। সকলে ফাদারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে আমি ওদের চাপে পিষ্ট হচ্ছিলাম। ঠিক তখনই অর্গানে সুর উঠল, 'বিদায় কুমারি মাতা…আমরা গাচ্ছিলাম 'হৃদয় আমাদের স্পন্দিত হয় তোমারই দয়ায়, এক ও সহস্রবার বিদায়।' আর তখনই পেছন দিক থেকে চিৎকার শোনা গেল 'যীশু রাজার জয় হোক! যীশু রাজার জয় হোক!'

একদল সশস্ত্র সৈন্য উঠান দিয়ে ঠেলে ধাক্কিয়ে বেদী পর্যন্ত পথ করে ঢুকে পড়ে। লোকজনের চাপে ও ধূপের গন্ধে আমার যখন মাথা ঘুরাচ্ছিল তখন ফাদারের উদ্দেশ্যে ওদের একজনের গলা শুনতে পাই: আপনাকে আসতে হবে আমাদের সাথে। কারণটা জানেন। গোলমাল না করে চলে আসুন।
তখনও অরগান বাজছিল।

আমাকে শেষ করতে দিন, ফাদার বলেন। আশীর্বাদ শেষ করার পর যেখানে বলবেন সেখানেই যাব।
তারা ফাদারকে প্রার্থনা টেবিল থেকে উঠে পবিত্র কক্ষ পর্যন্ত যেতে দেয়। তার কোন ভয় নেই বলে মনে হল। আমি ভেবেছিলাম এটা অবশ্যই কুমারী মাতার প্রতি তার বিশ্বাস। তিনি কক্ষটি খুললেন এবং বিশাল এক পবিত্র চালের রুটি (অস্টিয়া) বের করলেন। এক সহকারী একটি বাকশো থেকে সোনা ও লাল পাথর দিয়ে বানানো মনস্ট্রেস এগিয়ে দিলে উনি বাকশো খুলে সব ভেতরে রেখে আমাদের কাছে ফিরে এলেন। আমরা সবাই ক্রুশ করছিলাম এবং ফাদার সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে পবিত্র কক্ষে প্রবেশ না করা পর্যন্ত অর্গানটি বাজতে থাকে। আমি অনুসরণ করতে থাকি। দরজা পর্যন্ত গেলে দেখতে পাই যে তিনি ফাদারের চাদর খুলে হ্যাট পরছেন। সৈন্যরা তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি তাদের অনুসরণ করেন। পবিত্র হৃদয়ের অধিকারিনী কুমারি মাতার উপর বিশ্বাস হারানোর জন্য আমার কাছে ওইটুকুই ছিল যথেষ্ট।

সেই রাতে আমি ভয়ে ও ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় শুয়ে পড়ি, কিন্তু তারপরও মা-বাবার বাড়িতে যাইনি। তার আগে আমাদের বন্ধু চেমার সাথে কথা বলছিলাম। সে আন্দ্রেসের ব্যাপারে তদারকি করছিল। আন্দ্রেসের বিরুদ্ধে এমন একজন ব্যক্তিকে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছিল যে সনদ জাল করেছিল এবং সেগুলি সেনা প্রশিক্ষকদের কাছে বিক্রি করেছিল। তারা বলছিল যে আন্দ্রেস তাকে হত্যা করেছিল কারণ পরিকল্পনাটি তারই ছিল এবং সে-ই পুরো উদ্যোগের প্রধান ছিল। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সচিব মিথ্যা সনদগুলি আবিষ্কার করে জালকারীকে সনাক্ত করে। আন্দ্রেস ভয় পেয়ে তাকে সরিয়ে দেয়, কারণ সে-ই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানত।

চেমা বলেছিল যে এটি অসম্ভব, আমার স্বামী এমন তুচ্ছ কিছুর জন্য হত্যা করবে না। আর এইরকম গাধামীর ব্যবসায় ও ঢুকবেই না। আসলে গভর্নর পাইয়ারেস তাকে ঘৃণা করে এবং পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই গ্রেপ্তার করিয়েছে।
আমি বুঝতে পারিনি কেন সে আন্দ্রেসকে ঘৃণা করবে। সে তো হেরেই গিয়েছিল। তার হাতে তো এখন ক্ষমতা অসীম। হেরে যাওয়াটাই কি আন্দ্রেসের জন্য যথেষ্ট ছিল না?

পরের দিন আন্দ্রেসের চৌদ্দ শিকের পেছনের ছবি খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়। আমি বাড়ি থেকে বেরুতে সাহস পাচ্ছিল না। নিশ্চিত ছিলাম কেউ আমার সঙ্গে কথা বলবে না। চিলেস এন নোগাদা(মাংশের কিমা ভর্তি পোবলানো নামক মেক্সিকান এক মরিচ দিয়ে তৈরি খাবার) বানানোর জন্য উপাদানগুলির নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমার। আমি না যেয়ে পারিনি। সাড়ে দশটায় পৌঁছে যাই। পিচফল, আপেল, কলা, কিসমিস, আলমন্ড, টমেটো এগুলো নিয়ে আমি নির্ঘুম মুখে সাড়ে দশটায় উপস্থিত হই। মুন্ঞসদের রান্নাঘরটা বিশাল, একে অন্যের সাথে ধাক্কা না লাগিয়ে বিশজন রান্না করতে পারতাম। আমি যখন উপস্থিত হই তখন সকলে ওখানে ছিল।
তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। বলে ক্লারিতা।
"মানে হচ্ছে…"
"কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই পৃথিবীতে খাবার নির্ভর করে মেয়েদের উপর। এটি আমাদের পেশা, হেলাখেলা নয়। ফলগুলো কাটতে লেগে যাও। গ্রুপ বানিয়ে ফেলো তোমরা।
শুধু মনিকা, পেপা এবং লুসিয়া মাওরের এগিয়ে আসে। বাকিরা টেবিলের অপর পাশ থেকে আমাকে দেখছিল। চাচ্ছিলাম ওরা বলুক আন্দ্রেস খুনি। ওরা ওর বউয়ের সাথে সম্পর্ক রাখবে না। কিন্তু পুয়েব্লাতে ব্যাপারগুলো ওভাবে ঘটে না।

করমর্দনের জন্য কেউ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়নি, কিন্তু তারা কি ভাবছে তাও বলেনি।
মনিকা এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। ছুরি দিয়ে ধীরে ধীরে কলা কুটতে কুটতে জিজ্ঞাসা করেছিল কেনো জেনারেলকে নিয়ে গেছে। কী ঘটেছে তার সত্যতা আমি জানতাম কিনা। লুসি মাউরের আমার কাঁধে তার হাত রাখে, তারপর আমার ঝুড়ি থেকে যে আপেলগুলি নিয়েছিল তার খোসা ছাড়াতে লাগে। পেপা দাঁত দিয়ে তার নখ খুটা বন্ধ করতে পারে না। এর মধ্যে আমাকে এত প্রশ্ন করার জন্য মনিকাকে ধমক দেয়। আর যখন মনিকার জিজ্ঞাসাবাদ থামাতে সক্ষম হয় আমাকে বলে, রাতে কি ভয় পেয়েছিস?
"কিছুটা," আমি পীচ কাটতে কাটতে বলি।
আমরা মুন্ঞসদের বাড়ি থেকে বের হয়ে পার্সলে ও ডালিমদানা দিয়ে সাজানো সিলেসের রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়াই। ঠিক দুটোর সময় আমার বান্ধবীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি আসে।
মনিকার জন্য মা অপেক্ষা করছিল, গাড়িতে ওঠার আগে মনিকা বলল, "ওদের পাত্তা দিও না।"

হেঁটে বাড়িতে যাই। পকেট থেকে বিশাল চাবিটা বের করে দরজা খুলি। আন্দ্রেস, চিৎকার করি। কেউ তার উত্তর দেয় না। সিলেসের থালাটা মেঝেতে রেখে চিৎকার করতেই থাকি—আন্দ্রেস…আন্দ্রেস, কোনো উত্তর পাই না। থালার উপর হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে থাকি।

দরজার দিকে পিঠ দিয়ে বসেছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে দেখতে পাই, বাগানের গাছগুলো কী সবুজ। আর তখনই বিশাল ছিটকিনিতে আওয়াজ হয়, যেমনটি করে থাকে আন্দ্রেস। আচ্ছা, তোমার চাররোর জন্য কাঁদছ? মেঝে থেকে উঠে হাত দিয়ে স্পর্শ করি। বেলা তিনটার সূর্যকিরণ কাচের মধ্য দিয়ে উঠোনে এসে পড়ছিল। দ্রুত জুতো ছেড়ে পোশাকের বোতাম খুলতে শুরু করি। ওর জামার নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে টেনে ওকে বাগানের ঘাসের উপর নিয়ে যায়। ওখানে প্রমাণ পাই কারাগারে ওর ধোনটা কেটে নেওয়া হয়নি।
হঠাৎ মনে পড়ে যায় চিলেস এন নোগাদার কথা। দৌড়ে থালাটা নিয়ে আসি। গ্রোগ্রাসে খেয়ে ফেলি।
তোমাকে কেনই-বা নিয়ে গেছে কেনই-বা ফিরিয়ে দিয়েছে?—জিজ্ঞাসা করি।
নিয়েছিল হারামজাদা তাই। ফিরিয়ে দিয়েছে গাধা বলে।

পরের দিন খবরের কাগজে বের হয় কাইয়ের আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করার জন্য ফাদারকে দু বছর জেল দেওয়া হয়েছে। আর জেনারেল আন্দ্রেস আসেনসিও নিষ্কলুষ মুক্তি পেয়েছে। টাইটেল জালকারীর খুনের অভিযোগের ব্যাপারে নির্দোষ প্রমাণ হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা গ্রেফতারের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছে।

আমি আর রান্নার ক্লাসে ফিরে যেতে চাইনি। আন্দ্রেস কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলি, কিভাবে ওরা আমাকে দেখছিল! আর কি ব্যবহার ওদের কাছ থেকে পেয়েছি! তখন সে আমাকে ওর দিকে টানে আর আমার পাছায় একটা থাপ্পড় মেরে বলে, জিনিসটা খাসা। আরেকটু অপেক্ষা করো, আমি যখন ক্ষমতায় আসব, তখন যেও।


আমার অপেক্ষার সময়টা অনেক লম্বা ছিল। আন্দ্রেস পরবর্তী চার বছর বাড়িতে ঢুকত আর বের হতো। মাঝে মাঝে মনে হতো আমি তার জন্য একটা বোঝা, কখনো কখনো মনে হতো সে আমাকে কিনে এক বাকশের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছে, আবার কখনো এমনো মনে হতো, আমি তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা। কখনো জানতাম না আমি ভোরে কোন অবস্থায় উঠব। সে আমাকে ঘোড়ায় চড়তে নিয়ে যাবে নাকি রোববারের দিন ষাড়ের লড়াই দেখতে নিয়ে যাবে, অথবা সপ্তাহজুড়ে বাড়িতেও আসবে না। এমন কিছু তার উপর ভর করেছিল যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না, এমন কিছু নিয়ে মেতে ছিল যা আমি বুঝতে পারতাম না। আমি পুচকে মেয়ে ছিলাম, হঠাৎ হঠাৎই আমার ভেতর খুব বিষন্ণতা জেগে উঠত। আবার ঐ একই কারণে আনন্দ হতো। এমন একটা মেয়েতে পরিণত হয়েছিলাম যে কিনা বিষাদ থেকে এই হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলতাম। সব সময়ই আশা করতাম, কিছু একটা ঘটুক, সে যাই হোক না কেন। কিন্তু কোনোভাবেই যেন সকালগুলো একইরকম না হয়। আমি নিস্তরঙ্গতা ঘৃণা করতাম, কারণ ভয় করত। অনেক সময় মাসিক হওয়ার সাথে সাথে বিষণ্নতা জমা হতো। এ সম্পর্কে জেনারেলকে কিছুই বলা যেত না। কারণ পুরুষদের কাছে এ সমস্ত ব্যাপার কোনো গুরুত্ব পায় না। আমার মার মতো এ ব্যাপারে আমার লজ্জা হতো না। উনি এ সমস্ত নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পেতেন বলে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে লাল ন্যাকড়া ধোয়া শিখিয়েছেন। পুয়েব্লাতে আমরা মাসিকের সাংকেতিক নাম পড়িয়েছিলাম পেপে ফ্লোরেস। আহা আমার কি ইচ্ছে করছে পেপে ফ্লোরেস যাতে আমার সঙ্গে দেখা করে যায় অথবা আমার বাড়িতে যেন বেড়াতে আসে। যাতে করে আমার একঘেয়েমিটা কাটে। যখন বিষণ্নতা ভর করত তখন আমি পেপে ফ্লোরেসের কথা চিন্তা করতাম। যদি সে এখন আমার হতো তাহলে আমি প্রতি মাসে পাঁচ দিন সমুদ্র দেখতে পারতাম।

নয় নম্বর উত্তরের বাড়িতে দুটো কৃষ্ণচূড়া আর উঁচুউঁচু কিছু গাছ ছিল। দুটো জাকারান্দা আর একটা পিরু ছিল। ওগুলোর পিছনে ছোট্ট একটা মাটির ইটের ঘর ছিল যেটা ঢাকা ছিল বাগান বিলাস দিয়ে। আর একমাত্র জানালা দিয়ে ছোট্ট একটা আকাশ ঢুকে পড়ত যেটা ঋতুর সাথে সাথে বদলে যেত। আমি জোড়াসন করে বসতাম কোনো কিছু চিন্তা না করার জন্য। শরীরের নিচের দিকে যে জায়গাটা কেশ দিয়ে ঢাকা ওই জায়গাটাসহ পাদুটো আর কোমরের ব্যাথা দূর করতে আনিস পান করতাম। আমার গালের দু পাশে লাল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি আনিস পান করতাম, সামনে যে থাকত তার সাথেই কথা বলতাম, আর কেউ না থাকলে একা একাই বকবক করতাম। আমার মুখে আশ্চর্য রকমের সাহস এসে ভর করত, আর সমস্ত রাগ যেগুলো আমি জেনারেলের উপর ঝাড়তে পারতাম না, শূন্যে ছুঁড়ে দিতাম।

আন্দ্রেসের হাতে তখন রাজ্যের সমস্ত মিলিটারি অপারেশনের কর্তৃত্ব ছিল। মিলিটারিরা তখন ওর উপর নির্ভর করত। খুব সম্ভবত ঐ সময় সে জনসাধারণের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আর ঐ সময়টাতেই তার সঙ্গে পরিচিত হয় হেউস ও অন্যান্যদের, যাদের সে নিরাপত্তা দিত। আন্দ্রেস তখন প্রচুর কামাত। হেউস ছিল এমন গ্রিঙ্গ যে কিনা রাস্তায় রাস্তায় চিৎকার করে ঔষধ আর বোতাম বিক্রি করত। কোনোভাবে মেক্সিকোতে ওনোরারি কনস্যুলের কাজ জুটিয়ে নেয়। কাররানসার সময়টাতে নিজে অপহরণের নাটক সাজায়। ওকে উদ্ধার করার জন্য সরকার ওকে যে মুক্তিপণ দেয়, তা দিয়ে পাঁচ নম্বর দক্ষিণে সেফটিপিনের কারখানা খোলে। নতুন নতুন ব্যবসা আবিষ্কারে ওর কোনো জুড়ি ছিল না। ওই ফন্দিগুলো ফাঁদার সময় ওর চোখগুলো জ্বলজ্বল করে। গাবাডিনের এক প্যান্টে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটিয়ে দিত। পুয়েব্লার যে লোকগুলো তাকে পথের ফকির হিসেবে আসতে দেখেছে তাদের নাকের ডগা দিয়ে এত ধনী হয়ে গেল শেষশেষ ডন মিগেল বলে ওদের ডাকতে হতো। সকলে জানত ও খুব বুদ্ধিমান, আর ওর বুদ্ধিগুলো ছিল চমকপদ্র। তবে সত্যিকার অর্থে সে ছিল ঠকবাজ।

প্রথমদিকে আমি সেটি জানতাম না। আসলে কারো কথাই জানতাম না। আন্দ্রেস আমার সাথে অর্থহীন কথাবার্তা বলত আর সপ্তাহে তিনবার লাগাত। সে আমাকে খেলনার মতো বাকশে লুকিয়ে রাখছিল, যে খেলনাটিকে পিঠ চুলকে দিলে আর রোববারের দিন সোকালো(শহরের কেন্দ্রস্থল) নিয়ে গেলেই খুশি হয়ে যেত। যেদিন তাকে গ্রেফতার করে সেদিন থেকে তার ব্যবসা সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করতে শুরু করি। এ সম্মন্ধে বলতে ওর ভালো লাগত না। বলত টাকা পয়সার দরকার হলে চেয়ে নিতে, আর ব্যবসায়িক আলাপ করার জন্য সে আমাকে বিয়ে করেনি। মাঝে মাঝে মনে হতো, ঠিকই বলছে। বাড়ির ভাড়া কিভাবে দেয়, কিভাবে চকলেট নিয়ে আসে, কিভাবে আমার সখ পূরণ করে তা জেনে আমার কী!
তখন আমি আমার অবসর সময়টাতে কিছু একটা করার উপায় খুঁজতে থাকি। আমার বান্ধবিদের খুঁজে নিই, ওদের এমব্রুয়ডারির কাজ আর বিস্কুট বানাতে সাহায্য করতাম। একসাথে আমরা পেরেস ই পেরেসের লেখা উপন্যাসগুলো পড়তাম। এখনো মনে পড়ে পেপে আনিতা দে মন্তেমারের সাথে কাঁদত আর আমি চরিত্রগুলোর অবাস্তব আচরণে প্রাণ খুলে হাসতাম। ওদের দোনাস রান্না করতে সাহায্য করতাম। স্পেনের মৃদুভাষী লোকের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। জানতাম না ঔ বিশ্রি লোকটাকে কেন বেছে নিয়েছে। যখন পেপা থাকত না তখন আমরা ঔ লোকটার ব্যাপারে বাজে বাজে কথা বললাতম। কিন্তু কখনোই মাস্ থেকে বেরুনোর সময় যে লম্বা ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসত, স্পেনের এই লোকটির বদলে ওকে বিয়ে করার কথা পেপাকে বলতে সাহস করিনি। শেষমেশ সে স্পেনিয়কেই বিয়ে করে। লোকটি ছিল পাগলের মতো সন্দেহবাতিকগ্রন্ত। এতই সন্দেহবাতিক যে বাড়ির বারান্দা ভেঙে ফেলে যাতে পেপা ওখান থেকে উঁকি দিতে না পারে।

ওর বিয়ের দিনে আমি হালকা সবুস রঙের সুতি পোশাক আর গলায় আন্দ্রেসের দেওয়া লম্বা মুক্তার হারটি পরি। সেদিন খুব ক্লান্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে বিছানা থেকে নড়তে ইচ্ছা করে না। আন্দ্রেস বরাবরের মতোই লাফিয়ে বিছানা থেকে ওঠে। প্রাতঃরাশ সারার জন্য ওকে অন্যান্য সকালের মতোই বাথরুমে যেতে দেখি। নিজের শরীরে কম্বল জড়িয়ে নিই, তখন আমার চাঁদে চলে যেতে ইচ্ছা করে। যখন শিশু ছিলাম তখন বিছানার একদম কোনায় গিয়ে খেলা করতাম, যেন আমি চাঁদে চলে এসেছি। প্রাতরাশ থেকে ও ফেরার সময় আমি চাঁদেই ছিলাম।

তোমার কি মাসিক হয়েছে? তা না হলে কেন পথের কুকুরের মতো মুখ করে আছ? এদিকে আসো, এদিকে, ভালো করে দেখি তোমাকে। আন্দ্রেস বলে। তোমার চোখগুলো গরুর মতো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। তুমি অন্তসত্তা নাকি? সে এমন পরিতৃপ্তির মুখভঙ্গি করে তাতে আমি বুঝতে পারি কতটা লাল হয়ে যাচ্ছি। আবার নিজেকে কম্বল দিয়ে ঢেকে ফেলি। বিছানার কোণায় চলে যাই।
তোমার কি হয়েছে? আমাকে একটা ছেলে সন্তান দিতে চাও না?
কম্বলের ভেতর থেকে আমি গলার স্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার ভরাট স্তনগুলো স্পর্শ করি, যা আমি কখনোই করতাম না। আর দিনগুলো গুণছিলাম যা কখনোই গুনতাম না। হিসাব করে দেখলাম গত তিন মাস যাবত পেপে ফ্লোরেসের সাথে দেখা নেই।

********
আমরা বিবাহ উৎসবে যাই। সব সময় ভাবছিলাম মা হওয়াটা কি বিশ্রি হবে, যে কারণে উৎসবের ব্যাপারটা ভালো করে মনে নেই। শুধু মনে আছে পেপা পরিস্কার মুখ নিয়ে গির্জা থেকে বেরুচ্ছে। অবগুণ্ঠন থেকে শুরু হয়ে ফুলগুলো সাদা লম্বা পোশাকের ঝুল পর্যন্ত নেমে গেছে। খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ওটাই বলছিলাম মনিকাকে। ও বের হওয়ার পর আমরা আমাদের আবেগকে চেপে রাখার জন্য হাত বাড়িয়ে দিই।
আমার ছেলে হতে যাচ্ছে। ব্রা্ইডাল মার্চের সময় ওকে বলি।
কী মজা! চিৎকার করে উঠে গির্জার মধ্যেই আমাকে চুমোতে শুরু করে।

চলবে…

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক