আনহেলেস মাস্ত্রেত্তা’র জীবন আমার উপড়ে নাও – দ্বিতীয় পর্ব

আনিসুজ জামান
Published : 30 May 2022, 11:49 AM
Updated : 30 May 2022, 11:49 AM


লেখিকার ছবি: পাস্কুয়াল বোসেইয়্যি ইগলেসিয়াস
আনহেলেস মাস্ত্রেত্তা (জ. ১৯৫৯) সমকালিন বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক। তাঁকে লাতিন আমেরিকার বুম-পরবর্তী সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি একইসঙ্গে সাংবাদিক, অভিনেত্রী ও প্রযোজক। নারীচরিত্রপ্রধান রাজনৈতিক উপন্যাস রচনার জন্য বিখ্যাত। তাঁর সাহিত্যে নারী চরিত্ররা ভীষণ সাহসী, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারা আত্মপরিচয় নির্মাণে যথেষ্ট সচেতন।

আনহেলেস মাস্ত্রেত্তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো উপন্যাসের নাম Arráncame la vida, যেটি Tear This Heart Out শিরোনামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে উপন্যাসটি অবলম্বনে সিনেমা নির্মিত হয়। মেক্সিকান রেভ্যুলেশনের সময় এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে রোম্যান্টির-রাজনৈতিক ধারার এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। সে বছর বইটি মেক্সিকোতে "বেস্ট বুক অব দ্য ইয়ার" পুরস্কার জেতে। এই উপন্যাসে মাস্ত্রেত্তা খোলাখুলিভাবে যৌনতার অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটি প্রধান নারীচরিত্র কাতালিনার বয়ানে রচিত। মেক্সিকান জেনারেল মাক্সিমিলিয়ানো আবিলা কামাচোর জীবনীর ছায়া অবলম্বনে লেখা। দুর্নীতিবাজ, হিংস্র ও নারীভোগী রাজনীতিবিদ তিনি। তার অসম-বয়সী স্ত্রী হয়ে কাতালিনা দৃঢ়তার সঙ্গে ন্যারেটরের ভূমিকা পালন করেছেন। উপন্যাসটি পাঠ করে প্রকৃত মেক্সিকো, মেক্সিকোর রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতা সম্পর্কে পাঠক ধারণা পাবেন।

উপন্যাসটি অনুবাদের স্বত্ত্ব নিয়ে স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন অনুবাদক আনিসুজ জামান। তিনি এরই মধ্যে গাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেসের পৃথিবীখ্যাত উপন্যাস নিঃসঙ্গতার একশ বছর এবং ওনেত্তির উপন্যাস কুয়া অনুবাদ করেছেন। সম্প্রতি তাঁর অনুবাদে আরো প্রকাশিত হয়েছে সমকালিন কলোম্বিয় ছোটোগল্পের সংকলন গাবোর দেশে গাবোর পরে
আজ প্রকাশিত হলো উপন্যাসটি দ্বিতীয় পর্ব।

মূল থেকে অনুবাদ: আনিসুজ জামান

"আমি আর তুমি।" সে বলে। "তবে অন্যদেরও নিতে হবে সঙ্গে।"
"আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই কিনা তুমি জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করোনি। তুমি নিজেকে কি মনে করো?"
'আমি নিজেকে কি মনে করি? আচ্ছা, আমি মনে করি, আমি আন্দ্রেস অ্যাসেনসিও। কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে ওঠো।'
সে ভিতরে গিয়ে বাবার সাথে তিনটি শব্দ বিনিময় করে সবাইকে পিছনে নিয়ে ফিরে এলো।
মা কাঁদছিলেন। আমার ভালো লাগল কারণ তাতে এক ধরনের সংস্কারের আবহ চলে আসে। মেয়েদের বিয়েতে মায়েরা সবসময় কাঁদে।
"মা, তুমি কাঁদছ কেন?"
"কারণ কিছু একটা ঘটবে বলে মনে হচ্ছে, মা।"
আমার মা তার সারা জীবন আগামবোধ নিয়েই কাটিয়ে দিলেন, যেন পরিণতিটা তার জানা ছিল।
আমরা সরকারি রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়েছিলাম। আন্দ্রেসের কয়েকজন বন্ধু সেখানে অপেক্ষা করছিল: তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রদলফো আর ওর বউ সোফিয়া। ওর স্বামী যুদ্ধে আন্ডার সেক্রেটারি হওয়া সত্ত্বেও আমার দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকিয়ে ছিল। আমার ধারণা আমার পা এবং চোখ দেখে তার হিংসা হচ্ছিল, কারণ ওর পা আর চোখ ছিল পাখির মতো শুকনো আর ছোট ছোট।

রেজিস্টার ছিলেন খাটো, টাকপড়া এবং গম্ভীর।
'বুয়েনাস কাবানঞাস', আন্দ্রেস বলল।
'বুয়েনোস দিয়াস, জেনারেল। কি সৌভাগ্য তোমাকে আজ পেলাম। সব কিছু প্রস্তুত।'
সে বিশাল এক খাতা বের করে ডেস্কের পিছনে তার জায়গা করে নিল। আমি তখনও মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, আন্দ্রেস আমাকে বিচারকের মুখোমুখি করে তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য ঠেলে দেয়। রেজিস্টারের মুখটা মনে পড়ছে, মদ্যপ লোকের মুখের মতো লালচে। তার ঠোঁট ছিল মোটা আর এমন করে কথা বলছিল যেন মুখে এক মুঠো বাদাম আছে।
"সেনঞরিতা কাতালিনা গুজমানের সঙ্গে জেনারেল আন্দ্রেস অ্যাসেনসিওর বিয়ে উদযাপন করিতে আমরা এইখানে একত্রিত হইয়াছি। আইনের প্রতিনিধি হিসাবে আমার অবস্থানে, পরিবার প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র আইনের প্রয়োজন থেকে আমি আপনাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, কাতালিনা : আপনি কি জেনারেল আন্দ্রেস অ্যাসেনসিওকে আমাদের সামনে আপনার স্বামী হিসাবে গ্রহণ করিতেছেন?
"ঠিক আছে।" আমি বলি।
"আপনাকে বলতে হবে "হ্যাঁ," রেজিস্টার সংশোধন করে দেন।
"হ্যাঁ," আমি বললাম।
"জেনারেল আন্দ্রেস অ্যাসেনসিও, আপনি কি সেনঞরিতা কাতালিনা গুজমানকে আপনার স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করিতেছেন?"
"হ্যাঁ," আন্দ্রেস উত্তর দেয়। "আমি করছি এবং আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে শক্তিশালীরা দুর্বলদের প্রতি যেমন সম্মান প্রদর্শন করে সে সবই। আপনি এখন প্রথাগত বক্তৃতাটা অন্যদের জন্য রেখে দিতে পারেন। আমরা কোথায় স্বাক্ষর করব? কলম নাও, কাতালিনা।

আমার কোনো স্বাক্ষর ছিল না, আমাকে কখনই কোনো কিছুতে স্বাক্ষর করতে হয় নি, তাই আমি যা করি তা হল আমার নামটি মার্জিতভাবে তির্যক করে লিখি। নানরা আমাকে এভাবেই শিখিয়েছিলেন : কাতালিনা গুজমান।
"দে অ্যাসেনসিও, এটা এখানে লিখো, সেনঞরা," আন্দ্রেস বলল, সে আমার কাঁধের উপর দিয়ে পড়ছিল।
তারপর সে একটি দ্রুত হিজিবিজি আঁকে, সময়ের সাথে সাথে যেটা আমি চিনতে পেরেছি, এমনকি এখন জালও করতে পারি।
"তুমি কি দে গুজমান লিখেছ?" আমি জিজ্ঞাসা করি।
"না সোনা, এটা এভাবে করা হয় না। আমি তোমাকে রক্ষা করব, তুমি আমাকে নয়। তুমি আমার পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছ, আমার হয়ে গেছ।" সে বলে।
"তোমার…!"
"সাক্ষী কারা?" আন্দ্রেসকে ডাকল, যে এতক্ষণে কাবানঞাস থেকে দায়িত্ব নিয়েছে। "এই ইউনেস, এখানে স্বাক্ষর করো। আর তুমিও, রদলফো। এ জন্যই তো তোমাদের এনেছি।"
আমার মা-বাবাকে স্বাক্ষর করতে দেখে আন্দ্রেসকে জিজ্ঞাসা করলাম তার বাবা-মা কোথায়। তখন পর্যন্ত আমার মাথায়ই আসেনি যে তারও মা-বাবা থাকতে পারে।
"শুধু মা এখনও বেঁচে আছেন, কিন্তু তার শরীর ভালো নেই।" সে এমন এক স্বরে বলে, আমি সেই সকাল থেকে ওকে ওইরকম স্বরে প্রথমবারের মতো কথা বলতে শুনলাম, একটি কণ্ঠস্বর যেটি সে শুধুমাত্র তার মায়ের কথা বলার সময় ব্যবহার করল। "সেই কারণেই আমার বন্ধু রদলফো আর সোফিয়া এসেছে। আমি পরিবার ছাড়া আসিনি।"
"যদি রদলফো তোমার পরিবারের পক্ষে স্বাক্ষর করে, তাহলে আমি চাইব আমার ভাই ও বোনেরাও স্বাক্ষর করুক।" আমি বলি।
"তুমি পাগল নাকি, ওরা তো বাচ্চা!"
"কিন্তু আমি চাই ওরা সই করুক। যদি রদলফো স্বাক্ষর করে, আমি চাই তারাও করুক। তারা আমার খেলার সাথী।" বলি।
"তাহলে তাদের স্বাক্ষর নাও। কাবানঞাস, বাচ্চাদের স্বাক্ষর নেন।"
আমার বোন এবং ভাইদের স্বাক্ষর দেওয়ার দৃশ্য আমি কখনই ভুলব না। আমরা তোনানসিন্তলা থেকে এত সম্প্রতি এসেছি যে এখনও ওদের গা থেকে চাষা গন্ধটা মুছে যায় নি। বারবারা নিশ্চিত ছিল যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি এবং ভীত চোখে আমার দিকে তাকাল। তেরেসা এইরকম খেলা খেলতে চায়নি। মার্কোস আর দানিয়েল স্বাক্ষর করল খুব গম্ভীরভাবে, তাদের চুল সামনের দিকে নামানো এবং পিছনে সোজা দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবসময় তাদের চুল এমন করে আঁচড়ায় যেন সামনে থেকে কেউ তাদের ছবি তুলতে যাচ্ছে। বাকিসব কোনো ব্যাপার না।
আমরা পিয়ার চুলে রিবন দিয়ে বানানো বিশাল এক ফুল বেঁধে দিয়েছিলাম। তার চোখ ডেস্কের উচ্চতায় ছিল, এবং উপর থেকে তাকে বিশাল সাদা ফুটকিওলা লাল রিবনের মোনঞ (রিবন দিয়ে বানান ফুল) দেখাচ্ছিল।

"পরে আবার বলো না যে তোমার পরিবার মোনঞ (ভাব ধরা অর্থে) ধরে নি," আন্দ্রেস বলে। সে আমার কোমরে চিমটি দিয়ে যথেষ্ট জোরে বলল যেন বাবা শুনতে পায়। তখন বুঝতে পারিনি কেন সে এটা বলেছিল; তবে আজ নিশ্চিত যে আমার বাবার উদ্দেশ্যেই বলেছিল। এতটা বছর ধরে অন্তত এইটুকু শিখেছি যে আন্দ্রেস অযথা কখনো কিছু বলে না। আর আমার বাবাকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি সে উপভোগ করত। আগের দিন বিকেলে তার সঙ্গে কথা বলেছিল। বাবাকে বলেছিল যে আমাকে বিয়ে করতে চায়। আর বাবা যদি তাতে মত না দেন, তবে তাকে রাজি করানোর উপায় তার জানা আছে। ভালোয় ভালোয় ঘি না উঠলে আঙুল তো বাঁকা করতেই হবে।
"ভালোয় ভালোয়-ই হবে, জেনারেল। এটি বরঞ্চ আমাদের জন্য সম্মানের ব্যাপার।" তার বিরোধিতা করতে অপারগ হয়ে বাবা বলেছিলেন।

অনেক বছর পরে যখন আন্দ্রেসের মেয়ে লিলিয়া বিয়ে করতে চেয়েছিল, আন্দ্রেস বলেছিল: "তুমি কি মনে করছ আমি আমার কন্যাদের ছেড়ে দেব যেভাবে তোমার বাবা তোমাকে দিয়েছিল? কক্ষনোই নয়। কোনো শালার পুত এসে রাতারাতি আমার মেয়েদের নিয়ে যাবে না। যে সব হারামিরা আমার কন্যাদের চুদতে চায় তারা সময় দেবে আমাকে যাতে আমি ওদের চৌদ্দগুষ্ঠি তদন্ত করতে পারি। আমি আমার মেয়েদের উপহার হিসেবে বিলিয়ে দেই না। যে তাদের চাইবে তাকে আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে এবং যাবতীয় কিছু মেয়েদের পায়ে রাখতে হবে। যদি দরাদরি করতে হয়, তা করব; যদি না হয়, তাহলে সে জাহান্নামে যাবে এবং তারা গির্জায় বিয়ে করবে, কারণ হিমেনেস পাদ্রীদের কাছে হেরে গিয়েছে।
পিয়া ওর নাম লিখতে জানত না, তাই সে দুটি চোখ দিয়ে একটি ছোট্ট বৃত্ত আঁকলো। রেজিস্টার তার মোনঞর উপর চাপর দিলেন এবং গভীর করে এক শ্বাস নিলেন যাতে কেউ খেয়াল না করে যে সে ধৈর্য হারাচ্ছে। ভাগ্যক্রমে, এটিই ছিল শেষ। রদলফো আর সফি দ্রুত স্বাক্ষর সেরে নিল। ওই মোটা দুই শূকর ক্ষুধায় মরে যাচ্ছিল।
আমরা পোর্টালে নাস্তা করতে গেলাম। আন্দ্রেস সবার জন্য কফি, চকলেট ও তামালেস অর্ডার করে।
"আমি কমলার জুস চাই।" বলি।
"তুমি অন্যদের মতোই মত কফি আর চকলেট পাবে। ঝামেলা পাকিও না।" আন্দ্রেস বকা দিয়ে বলে।
"কিন্তু আমি জুস না হলে নাস্তা করতে পারি না।"
"তোমার যা দরকার তা হল ভাল শাসন। এখানে এবং এখন থেকে তুমি জুস ছাড়া নাস্তা করতে শিখবে। তুমি কিভাবে ভাবলে সব সময় জুস পাবে?"
"বাবা, ওকে বলো আমি সকালে জুস খাই," আমি বাবাকে বলতে বলি।
"ওর জন্য কমলার জুস নিয়ে আসো," বাবা বললেন, এমন আদেশের সুরে যে ওয়েটার সেটা আনতে দৌড়ে গেল।
"ঠিক আছে। জুস নাও। হাহ্‌…যেন গ্রিঙ্গা (ব্যাঙ্গ করে আমেরিকানদের বোঝাতে) হয়ে গেছ। এদেশে কোন চাষার মেয়ে জুস দিয়ে দিন শুরু করে? যা চাইবে তাই যে পাবে এমন ধারণা মাথায়ও এনো না। একজন সামরিক লোকের সাথে জীবন কাটানো সহজ নয়। এটা আজ থেকে মাথায় রাখো, এবং চিরদিনের জন্য। আর আপনি, দন মার্কোস, মনে রাখবেন, সে আর আপনার ছোট্ট মেয়েটি নেই। আর এই টেবিলে আমিই হচ্ছি অধিকর্তা"।
এ সময় দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে, সোফির দাঁতে একটা উষ্ণ পাফ পেস্ট্রিতে কামড়ানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না।
"আমরা যদি পার্টিই করছি তো সকলে এত চুপচাপ কেন? আন্দ্রেস বলল। তোমার বোনের সবে বিয়ে হয়েছে। কোনো আনন্দ নেই? কোন হৈচৈ?"
"এখানে?" তেরেসা বলল, যাকে বোকার মতো দেখাত। "আপনি পাগল নাকি!"
কি বললে তুমি? আন্দ্রেস চেঁচিয়ে ওঠে।
ভালো হোক তোমাদের! অভিনন্দন। রীতি অনুযায়ী আমাদের দিকে চাল ছুড়ে চিৎকার করে উঠল বারবারা। 'অনেক শুভকামনা, কাতি।' সে বলল আর আমার চুলের উপর চাল ছিটিয়ে দিয়ে ডলতে লাগল—ঝাঁকিয়ে চাপড়িয়ে। 'অনেক শুভকামনা' সে আমাকে জড়িয়ে চুমু দিতে দিতে বলতেই থাকল যতক্ষণ না আমরা কাঁদতে শুরু করলাম।


আমরা কখনই অন্যান্য দম্পতির মতো ছিলাম না। বিয়ের পর থেকেই আমরা সবজায়গায় একসাথে যেতাম। কখনও কখনও শুধুমাত্র পুরুষরাই থাকত। আন্দ্রেস আর আমি যেতাম। সে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে তাদের মধ্যে ভিড়ে যেত। প্রায় সবসময় তার বন্ধুরা আমাদের নর্থের ৯ নম্বর বাড়িতে আসত। বাড়িটা আমাদের দুজনের জন্য অনেক বড় ছিল। শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি বাড়ি, সোকালোর কাছে, আমার বাবা-মায়ের বাড়ি এবং দোকানপাঠের পাশেই।

সব জায়াগায়ই পায়ে হেঁটে যেতাম, কখনো একা যেতাম না।

সকালে ঘোড়ায় চড়তে যেতাম। আন্দ্রেসের ফোর্ড চালিয়ে প্লাজা দেল চাররোতে পৌঁছলে সেখানে ঘোড়াগুলি অপেক্ষা করত। বিয়ের পরদিন ও আমাকে একটি ঘোড়া কিনে দিয়েছিল যার নাম দিয়েছিলাম 'দুঃস্বপ্ন'–যদিও সে আমার স্বপ্ন ছিল। আন্দ্রেস একটি অল্প বয়স্ক স্ট্যালিয়নে চড়ত যাকে আল কাপোনে বলে ডাকত।

আন্দ্রেস ভোর হওয়ার সাথে সাথেই উঠে পড়ে আদেশ জারি করত যেন আমি তার রেজিমেন্টের কেউ। একবার চোখ খুলতেই এক মিনিটও দেরি না করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ত। লাফিয়ে উঠে বিছানার চারপাশে দৌড়াতে দৌড়াতে ব্যায়ামের গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তৃতার পুনরাবৃত্তি করত। আমি চোখ ঢেকে চুপচাপ শুয়ে থাকতাম, সমুদ্রের কথা ভাবতাম, কিংবা হাসিমাখা মুখের কথা ভাবতাম। কখনও কখনও এতক্ষণ শুয়ে থাকতাম যে আন্দ্রেস যখন বাথরুম থেকে ফিরে আসত—যেখানে সে সংবাদপত্রে ডুবে থাকত—চিৎকার করে বলত:

"ঠিক আছে, অলসের ডিব্বা, ভান ধরেছ যেন খুব একটা কিছু ভাবছ, নিচে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। তিনশো পর্যন্ত গুণে চলে যাবো।"

স্বপ্নচারীর মতো আমি আমার গাউন ছেড়ে রাইডিং প্যান্ট পরে আঙুল দিয়ে চুল আঁচড়াতাম, আয়নার সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করতাম, ব্লাউজের বোতাম লাগিয়ে চোখ ঘষে পিঁচুটি ফেলতাম। তারপর বুটজোড়া হাতে ধরে দৌড়ে নিচে নামতাম, দরজা খুলতাম, দেখতাম সে ওখানে দাঁড়িয়ে গুণে যাচ্ছে।

"দুইশো আটানব্বই, দুইশো নিরানব্বই।…তুমি আবারও জুতো পরার মতো সময় পাওনি? অলসের হদ্য কোথাকার!" সে এরি মধ্যে ফোর্ডে উঠে গেছে, ইঞ্জিনটি পুনরায় চালু করে।

জানালা দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে তাকে চুমু দিয়ে তার চুল এলোমেলো করতাম, তারপর নিচে নেমে তার পাশে ওঠার জন্য গাড়ির পেছন দিয়ে দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে পাশে বসতাম।

দেল চাররো প্লাজাতে যাওয়ার জন্য শহরের বাইরে গাড়ি চালিয়ে যেতে হত। মোচিতো যখন ঘোড়াগুলোকে নিয়ে আসত সূর্য তখনও তেতে ওঠেনি। আন্দ্রেস কারও সাহায্য ছাড়াই ঘোড়ায় উঠত, তবে প্রথমে সে আমাকে ধরে দুঃস্বপ্নের পিঠে চড়িয়ে দিয়ে ওটার গলায় আদর করে দিত।

ওখানে সবই ছিল মাঠ আর মাঠ। তাই আমরা যে কোনো দিকে চরাতে পারতাম যেন এটা আমাদের নিজস্ব খামার। তখন কখনই মনে আসেনি যে আমাদের পরবর্তী সময়ে এত খামারের প্রয়োজন হবে। ওই মাঠটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।

কখনও কখনও আল কাপোনে কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়াই দৌড়ুতে শুরু করত। আন্দ্রেস লাগাম ছেড়ে দিয়ে ইচ্ছে মতো দৌড়াতে দিত। প্রথম কয়েক দিন আমি বুঝতে পারিনি যে ঘোড়াগুলি একে অপরকে অনুকরণ করে, দুঃস্বপ্ন এমনভাবে দৌড়াত যেন আমিই আদেশ দিয়েছি। আমি ভয় পেয়ে যেতাম। ওর প্রতিটি লাফের সাথে সাথে নিজেকে স্থির রাখতে না পারায় পাছা বাড়ি খেত স্যাডলের সাথে। পাছায় মরেতন (লালচে দাগ) পড়ে যেত আমার। প্রতি সন্ধ্যায় আমার জেনারেলকে সেটা দেখাতাম, তার হাসতে হাসতে মরে যাওয়ার অবস্থা হত।

"পাছা বাড়ি খাওয়াচ্ছ স্যাডলের সাথে। তা না করে ঘোড়া যখন দৌড়োবে তখন উঠে দাঁড়াবে।"

আমি তার নির্দেশ শুনতাম যেন তা কোনো দেবতার কাছ থেকে এসেছে।

সে সবসময় আমাকে অবাক করত এবং আমার অজ্ঞতা নিয়ে হাসতে পছন্দ করত।

"তুমি জান না কিভাবে ঘোড়ায় চড়তে হয়, কিভাবে রান্না করতে হয় আর কিভাবে সঙ্গম করতে হয়। জীবনের প্রথম পনেরোটা বছর করেছ কি?" জিজ্ঞাসা করে।

সবসময় দুপুরের দিকে ডিনারের জন্য বাড়িতে আসত আন্দ্রেস। আমি মুন্ঞস বোনদের সাথে রান্নার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম এবং ভাল রাঁধুনি হয়েছিলাম। এমনভাবে কেকের জন্য ময়দা ফেটে যেতাম যেন চুল আঁচড়াচ্ছি। আমি মলে, চিলেস এন নোগাদা, চালুপাস, চিলিয়াতোলে, পিপিয়ান এবং তিঙ্গা তৈরি করতে শিখেছি, এমনই অনেক পদ।
মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার বেলা দশটার ক্লাসে মোটের উপর আমরা বারোজন ছিলাম। তার মধ্যে আমিই একমাত্র বিবাহিত।
হোসে মুন্ঞস যখন তার বলা বন্ধ করে দেন, ততক্ষণে তার বোন ক্লারিতা টেবিলে উপাদানগুলি রেখে দিয়ে আমাদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
আমরা জুটি বেঁধে কাজ করতাম। যেদিন আমি মলে বানিয়েছিলাম সেদিন আমার জুটি ছিল পেপা রুগারসিয়া। ও শীঘ্রই বিয়ে করার পরিকল্পনা করছিল। যখন আমরা কাঠের চামচ দিয়ে তিল নাড়ছিলাম, তখন ও আমাকে জিজ্ঞেস করে, "এটা কি সত্যি যে এমন একটা সময় আসে যখন চোখ বন্ধ করে আবে মারিয়া দোয়া পড়তে হয়?"

আমি হেসেছিলাম। আমরা তিলগুলো নাড়তে নাড়তে ঠিক করলাম এই বিকালে কথা বলব। মনিকা এস্পিনোসা আমাদের পাশেই ছোটো চুলায় কুমড়োর বীজ ভাজছিল, সে বলে সেও আসছে।
সব ভাজা হয়ে গেলে সেগুলো পিষতে হয়।
"কারো সাহায্য নিতে পারবে না," মুন্ঞস বোনেরা বলে। "উদখল ব্যবহার শিখতে হবে।"
আমরা পালাবদল করছিলাম। মরিচ, কাজুবাদাম ও তিলের উপর হাত উঠিয়ে নামানোর জন্য আমরা একের পর উদখলের সামনে যাচ্ছিলাম। তারপরও অর্ধেকের বেশি আমরা ছেঁচতে পারিনি।
কিছুক্ষণ পর ক্লারিতা তার সরু বাহু দিয়ে কোমর ও পিঠ দুলিয়ে ক্ষিপ্ততার সাথে পাউডার বানানোর কাজে লেগে যায়। ওকে দেখে নিজেদের অকর্মা মনে হয়। সে দেখতে ছোট হলেও শক্তসমর্থ। পেষার সময় লাল হয়ে গেলেও, ঘামেনি।
এদিকে আসো, দেখতে পাচ্ছ। সে বলে। মনিকা করতালি দিতে শুরু করে, আমরাও যোগ দিই।
ক্লারিতা রান্নাঘরে বেসিনের পাশে হুকে ঝোলানো কাপড়ে হাত মোছে।
"জানি না তোমরা কীভাবে বিয়ে করতে যাচ্ছ, যাই করো না কেন, সব কিছুতেই তোমরা অজ্ঞ।"
বেলা তিনটার দিকে মুখচোখ সব লাল করে আমরা শেষ করি। এমনকি আমাদের চোখের পাপড়িতেও মলে লেগে ছিল।
তিতিরটাকে চৌদ্দভাগে ভাগ করে নমুনা হিসেবে প্রত্যেকে বাড়ি নিয়ে যায়।
যখন বাড়ি ফিরি রাস্তার কুকুরের খিদা নিয়ে আন্দ্রেস অপেক্ষা করছিল।
ওকে মলেটাকে খুলে দেখাই। সেটার উপর তিল ছিটিয়ে সাজিয়েছিলাম। পরে তরতিয়া(রুটি) ও বিয়ার সহকারে আমরা খাওয়ার জন্য বসি। কথা বলছিলাম না। খাবার খেতে খেতে হঠাৎ করেই মুখভঙ্গি হচ্ছিল কিন্তু খেয়ে যাচ্ছিলাম। সে থালাটা এমনভাবে চেটে খায় যে চিনেমাটির নীল নকশা নিচে দেখা যাচ্ছিল— আমি যে রেঁধেছি সেটা সে বিশ্বাস করতে চায় না।
আমরা সকলে মিলে করেছি।
"আসলে মুন্ঞজ বোনেরাই তো করেছে, তাই না!"

আমাকে একটা চুমু দিয়ে রাস্তায় বের হয় আন্দ্রেস। পেপা আর মনিকার সঙ্গে দেখা করতে আমি পোর্টালের দিকে যায়। যখন পৌঁছাই, ওরা ওখানেই ছিল। মনিকা কাঁদছিল, কারণ পেপা ওদের নিশ্চিত করে বলেছিল, কেউ যদি জিব চুষে চুমু দেয় তাহলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।

"গতকাল মা যখন অন্যমনস্ক ছিল আদ্রিয়ান আমাকে ঔ রকম একটি চুমু দিয়েছে। মনিকা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে।
আমার কথা বিশ্বাস করত না বলে আমি ওদের লা লুজ পাড়ার সেই জিপসি কাছে নিয়ে যাই। যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম পুরুষের ধোন কি কাজে লাগে এটা কি জানে তারা?
পেপা বলে, "হিসু করতে, তাই না?"
জিপসি মহিলার কাছে গেলে সে সব কিছু বলে। ওদের গায়ে একটা আস্ত ডিম বুলিয়ে পার্সলে পাতায় কামড় দিতে বলে। তারপর আমাদের তিনজনের হাত দেখে।
পেপা এবং মনিকাকে বলে জীবনে তারা সুখি হবে। বলে, তাদের মধ্যে একজনের ছয় সন্তান হবে এবং আরেকজনের চার। আরো জানায়, মনিকার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়বে আর পেপার স্বামী কখনই তার মতো বুদ্ধিমান হতে পারবে না।
"কিন্তু সে ধনী," মনিকা বলে।
"বিরাট বড়োলোক, সোনা। ও কখনোই গরীব হবে না।"
আমি যখন আমার হাত মেলে ধরলাম, সে আমার হাতের তালুর মাঝখানে টোকা মেরে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে।
"আরে, এখানে অদ্ভুত সব ব্যাপার দেখছি।"
"আমাকে বলো," আমি বলি।
"আরেক দিন। আজ দেরি হয়ে গেছে, আমি ক্লান্তও। যে উদ্দেশ্য নিয়ে আসছ, সেটা তো হয়েছেই, এখন যাও। ছেড়ে দেওয়া হাতটা আমি তখনো মেলে ধরেছিলাম, তখন মনিকা অনুনয় করে ওকে বলে। পরে সে কাছাকাছি এসে আবার দেখে, আবার আদর করে।
আসলে তোমার এখানে অনেকগুলো পুরুষ দেখতে পাচ্ছি। বলে, শুধু তাই না, অনেক লজ্জার ব্যারাপও আছে।
আরেকদিন এসো। আজ স্পষ্টভাবে দেখতি পাচ্ছি না। মাঝে মধ্যে আমার এমন হয়। বলে সে আমার হাত ছেড়ে দেয়। আমরা মেচের কাছে ক্যাফেতে তরতাহ খেতে যাই।
আমার ভালো লাগত যদি তোমার মতো আকর্ষণীয় একটা হাত থাকত। আমরা যখন ৩ ওরিয়েন্টের পূর্ব পাশ দিয়ে তার বাড়ির পথে হাঁটছিলাম তখন পেপা বলে।
সে রাতে জেনারেলের পাশে শুয়ে ওর পেটে আদর করি।
পরে কি হবে কে জানে, এখনই ওকে পেতে চাই। ভাবি।
জেনারেল নাক ডেকে উত্তর দেয়।

চলবে…

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক