আমি কি ভুলিতে পারি… আবদুল গাফফার চৌধুরী স্মরণে

হাসান হাফিজহাসান হাফিজ
Published : 21 May 2022, 09:29 AM
Updated : 21 May 2022, 09:29 AM


নক্ষত্রের বিদায়। বর্ণিল এক অধ্যায়ের অবসান ঘটে গেল। কিংবদন্তি সাংবাদিক, কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী আর নেই। ৮৭ বছর বয়সে লন্ডনে তাঁর জীবনাবসান হয় ১৯ মে ২০২২। জীবদ্দশায় শেষবারের মতো মাতৃভূমি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৯ সালে। সেবার ৯ জুন ২০১৯ আমি এবং আমিরুল মোমেনীন মানিক তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি চেঞ্জ টিভির জন্য। বিশাল সেই ইন্টারভিউ তিনটি পর্বে ইউটিউবে দেওয়া আছে। সেই সাক্ষাৎকারের কিছুটা অংশ দিয়ে এই রচনার সূচনা।
প্রশ্ন: আপনি একজন সফল সাহিত্যিক, কিন্তু আপনার সাংবাদিকতা, কলাম লেখার কারণে সেটা চাপা পড়ে গেছে। এটা কি আপনাকে পীড়িত করে? আপনি কবি, গীতিকার ও কথাশিল্পী…
উত্তর : নিশ্চয়ই পীড়িত করে। আমার তো সাহিত্যিকও হওয়ার বড় ইচ্ছা ছিল। আমরা যখন সাহিত্য করি, তখন সাহিত্যের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন ছিল না। একটা উপন্যাস লিখলে এখন তো অনেক টাকা পাওয়া যায়। তখন একশো টাকা প্রকাশকরা দিতেন, তাও কয়েক ভাগে। বিয়ে করার পর দেখলাম যে, শুধু সাহিত্য করলে টিকে থাকা যাবে না। তখন তো পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের রাজত্ব এখানে। তখন বাঙালি, আমাদের পূর্ব বাংলার সাহিত্যিকদের বই ক'টা বিক্রি হতো? বারো শ বই বিক্রি হতে বারো বছর লাগত। বাজার সয়লাব করা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, এমনকি শশধর মুখার্জির লেখাও চলত।
প্রশ্ন : এখন আপনি কি সৃষ্টিশীল লেখা কিছু লিখছেন? মানে কলাম লেখার চাপ অনেক আছে।
উত্তর : খুব কম লেখা। প্রথমত বাংলাদেশে আমি ৪২ বছর অনুপস্থিত। ফলে এখানকার তরুণ প্রজন্মের মন মানসিকতা আমি ঠিক আগের মতো অনুধাবন করতে পারি না।
প্রশ্ন : সারাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেও তো লিখে যেতে পারেন।
উত্তর: সারাজীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু সামাজিক যে পরিবর্তনগুলো, এগুলো অনেক সময় আমাকে ধাক্কা দেয়, যেমন- আমি ২২ বছর দেশে আসি নি, তার ফলে যখন বাংলাদেশের এক মেয়ে লন্ডনে গেলেন, নববিবাহিত, আমার এক বন্ধুর পুত্রবধূ হয়ে গেলেন। আমি তাকে দাওয়াত দিলাম রেস্টুরেন্টে, তখন আমাদের মধ্যে কথা হলো যে ওখানে ড্রিংকস চলবে কি না। বাঙালি মেয়েরা তো ড্রিংক দেখে না। মেয়েটি বলে উঠল, আমি ড্রিংক করি। এটা আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। এরকম হতে পারে, বুঝতে পারি নাই। পন্ডিত রবিশঙ্কর এলেন ঢাকায়, আমিও তখন লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছি। উনি আমাদের কিছু সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ করলেন- শামসুর রাহমান, আমিও ছিলাম, আরো কয়েকজন ছিলেন। সেখানে দেখি মেয়েরা অবাধে, ২০-২৫ বছরের মেয়েরা অবাধে ড্রিংক করছে। আমি ধাক্কা খেয়েছি, যেহেতু আমি জানতাম না। এখন অবশ্য অভ্যস্ত হয়েছি, পোশাক আশাকে অভ্যস্ত হয়েছি, এমনকি যে বাংলা নাটক, নাটকের যে ডায়লগ, সেটা আমার সময়ে মানে একেবারেই দেওয়া যেত না। প্রকাশ্যেই বলছে আমরা অ্যাফেয়ার করব, আমরা এটা করব, আমাদের সময় তো ইউনিভার্সিটির বটতলায় ছেলেমেয়েরা একত্রে বসতেও পারত না।
প্রশ্ন: পরিবর্তন হয়েছে…
উত্তর: সামাজিক পরিবর্তন অসাধারণ হয়েছে। সবগুলো পরিবর্তনের সঙ্গে আমি পরিচিত নই। ফলে একটা উপন্যাস লিখতে গেলাম, দেখা গেল আমার নায়ক-নায়িকারা দুই দশক আগের, এই দশকের না… (হেসে)।
প্রশ্ন: কবিতা তো লিখতে পারেন। আপনি এত ভালো কবি ছিলেন।
উত্তর: কবিতা তো লিখি। কবিতাতেও একটা পশ্চাৎপদতা এসেছে। ত্রিশের দশকের যে ভাষা, সেটা শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে আবার সবাই অনুকরণ করেছি।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনি যখন সাংবাদিকতা করছেন, আপনার কিছুটা অনুজ শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী তারা কিন্তু কবিতায় থিতু হয়ে আছেন নানা কষ্টের পরও…: বিচ্ছিন্নতার কারণে একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে।
উত্তর : কিন্তু তাদের জগতের সঙ্গে আমারও গ্যাপ তৈরি হয়েছে, তাদেরও একটা, শামসুর রাহমানের কবিতা কী এখন আধুনিক কবিতা বলা চলবে না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা তো চির আধুনিক, তা সত্ত্বেও তাঁর ললনা, নয়ন, লোচন এই শব্দগুলো এখন মৃত। শামসুর রাহমানের কবিতায় এমন অনেক শব্দ এখন মৃত। এখন যে উত্তরাধুনিক কবিতার যুগ শুরু হয়েছে, এটা বেশ কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের পঞ্চাশ দশকের যে সাহিত্যের ধারা এটাকে পেছনে ফেলে দেবে।
প্রশ্ন : আপনার সঙ্গে আদর্শগত তফাত থাকলেও কবি আল মাহমুদকে নিয়ে মৃত্যুর পরে আপনি লিখেছেন, তাঁর মৃত্যুর পরে…
উত্তর : তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত আর আমার রাজনৈতিক মতের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। আমি তো তাকে জাজ করতে বসি নাই সে কী ধরনের? তার প্রথম পরিচয় সে একজন কবি, কবিতার ভিতর তিনি কী বলেছেন, কবিতায় তিনি জামাতিদের ভাবধারা নিয়ে কিছু বলেন নি, ইসলামিক ভাবধারা আছে। ফররুখ আহমদের মধ্যে ইসলামিক ভাবধারা আছে, জামাতি ভাবধারা ছিল না। তাঁকেও নিয়ে রাজাকার বানানো হয়েছে, এটা ঠিক না।
প্রশ্ন : তার মানে আল মাহমুদের লাশ কি, মরদেহ কি শহীদ মিনারে না নিতে দেওয়া কি সঠিক হয় নি?
উত্তর: না, এটা সঠিক হয় নি।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ তো বিভক্ত হয়ে আছে। রাজনৈতিক প্রশ্নে, একদিকে আওয়ামী লীগ, একদিকে বিএনপি। এই জিনিসটা বাংলাদেশের জন্য কতটা মঙ্গলজনক, কতটা ক্ষতিকর? আপনার কী মনে হয়?
উত্তর: ক্ষতিকর হয়েছে। সাহিত্যের যে একটা আধুনিক ধারা, তার ভিতরে ধর্মান্ধতা, তার মধ্যে অন্য ধরনের ইজম নিয়ে নিয়ে এসে যুদ্ধ করলে যেটা শুরু করেছে বিএনপি। জাতীয়তাবাদী সাহিত্য দল করেছে, যেটা আমাদের সময়ে প্রগতিশীল সাহিত্যিক বা প্রতিক্রিয়াশীল সাহিত্যিক এই হিসাবে যেটা ভাগ ছিল। তাদের ভিতরে একটা সমঝোতা ছিল। এখন তো 'তুই রাজাকার', 'তুই ভারতের এজেন্ট' এই ধরনের।

প্রশ্ন: আপনি একটা বক্তৃতা দিয়েছেন বাংলা একাডেমিতে, বেশ কয়েকবছর আগে, সেই বিখ্যাত গান নিয়ে। সেটা আমি কাভার করেছিলাম সাংবাদিক হিসাবে। অনুষ্ঠানের নাম ছিল- একটি গানের জন্ম, আমি কি ভুলিতে পারি? আপনিই আবার গত বছর আপনার জন্মদিনে বলেছেন, এই গানটি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তো বিষয়টা এখন আপনাকে কতটা আনন্দ দেয় বা কতটুকু পীড়িত করে?
উত্তর : পীড়িত ঠিক করে না, তবে এখন সব জায়গায় গেলেই আমার পরিচয় আবদুল গাফফার চৌধুরী সাহিত্যিক, সাংবাদিক না, একুশের গানের রচয়িতা। গানটিই আমাকে পরিচিত করে।
প্রশ্ন: এটা তো এখন গ্লোবালি ছড়িয়ে পড়েছে।
উত্তর : দুঃখ পাই না যে কোনোভাবেই। আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা নেই, কেউ অমর নয়। রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত আজকে শুধুমাত্র গানের ক্ষেত্রে বেঁচে আছেন।
প্রশ্ন : রবীন্দ্রনাথ বলেও গেছেন- বাঙালিকে আমার গান গাইতেই হবে…
উত্তর: রবীন্দ্রনাথের যে অমর সাহিত্য, এগুলো আজকের লোকে পড়ে না। 'গোরা'' কি কেউ পড়ে? আমার গানটা ছিল কবিতা, তা থেকে প্রথমে লতিফ ভাই, তারপরে আলতাফ মাহমুদ সুর দিয়েছেন। তারপরে যে গান লিখেছি, আসলে আমি কবিতা লিখেছি।
প্রশ্ন : কিছু মার্কসিস্ট বা কমিউনিস্ট যারা তরুণ বয়সে ধর্মকর্ম করেন এরকম আমরা দেখি, তিনি হয়তো মার্কসিস্ট বা প্রোগ্রেসিভ মুভমেন্টের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু শেষ বয়সে গিয়ে ধর্মকর্মে জড়িত হন, মানে তার মাঝে একটা স্রষ্টা-ভীতি আসে। আপনি এই বিষয়টা কীভাবে দেখেন?

উত্তর: এটা বার্নার্ড শ বলেছিলেন যে ২০ বছরে যদি কেউ কমিউনিস্ট না হয় এবং ৪০ বছরে গিয়ে তার উল্টোটা না হয়, তাহলে বুঝতে হবে তার মানসিক বিকাশ হয় নি। (হাসি) এজন্য আঠারো বা বিশ বছর বয়সে আমরা সবাই বিদ্রোহী থাকি, কবি থাকি, প্রেমিক থাকি কিন্তু ক্রমশ যখন বয়স বৃদ্ধি পায়, অভিজ্ঞতা বাড়ে তখন আমাদের বিশ্বাসটা সুযোগ সুবিধার লোভে আমরা ধরে রাখতে পারি না। ভারতবর্ষেও হয়েছে। যেমন আমাদের শ্রী অরবিন্দ, তিনি ছিলেন সন্ত্রাসী, টেররিস্ট লিডার, পরে হয়ে গেলেন আশ্রমের শ্রী ভগবান। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ধর্মকর্ম মানতেন না, পরে পরমকৃষ্ণ রামকৃষ্ণের এমন ভক্ত হলেন, তার উপর জীবনী লিখলেন, সে বই লক্ষাধিক কপি বিক্রি হল। পরে বেলুড় মঠে গিয়ে পড়ে থাকতেন, সেটাও দেখেছি। আমার বন্ধু আনোয়ার জাহিদ, আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অসম্ভব বিপ্লবী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এরশাদের ঝাড়ুদার মন্ত্রী হলেন। তিনি বিস্ময়কর সব ঘটনা ঘটাতেন।

প্রশ্ন : আপনি ইসলাম সম্পর্কে তরুণ বয়সে যা ভাবতেন, এই প্রান্তে এসে প্রাজ্ঞতার উচ্চতায় উঠেও কি তাই ভাবেন?
উত্তর : আমি মূল ইসলাম সম্পর্কে আগে যা ভাবতাম, এখনো তাই ভাবি। বার্নার্ড শ'র মতে এটা একটা বিপ্লব। ইসলাম একটা বিপ্লব। মক্কায় ছিল কৃষি বিপ্লব, বেদুইনদেরকে সম্পত্তিতে ফিরিয়ে এনে চাষবাসে ফিরিয়ে এনে একটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার, ঠিক আধুনিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তখনকার ভাবধারা অনুযায়ী যেখানে বাইতুল মাল তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে টাকা দিয়ে সবাই সমানভাবে টাকা পাবে। একটা প্রাথমিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য ছিল হযরত মুহাম্মদের।
প্রশ্ন: এটা কি উনি করেছেন?
উত্তর : এটাকে পরবর্তীকালে তাঁর বংশের কিছু লোক যেমন হযরত আলী, তার পরবর্তী কিছু খলিফারা এটাকে সুলতানাতে পরিবর্তন করেন। স্থায়ীভাবে খলিফা হবে নির্বাচিত, ঐটাকে করে ফেললেন স্থায়ী সুলতানাত। এই সুলতানাত থেকে তারপর মারামারি, ধরাধরি এসব হয়েছে। তবে আমার প্রাথমিক ইসলাম সম্পর্কে শ্রদ্ধা, হযরত মুহাম্মদ যে একজন উঁচুদরের দার্শনিক ছিলেন, এ সম্বন্ধে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
প্রশ্ন: একটি প্রশ্ন করছি- আপনার জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন আপনার মতে কী?
উত্তর : আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বাঙালি হওয়া।
প্রশ্ন: আর ব্যর্থতাটা কী? যদি থেকে থাকে…
উত্তর: প্রচুর ব্যর্থতা আছে। সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। আমি হতে চেয়েছিলাম একজন সাহিত্যিক, একজন সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ লেখক, যা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারবে, সেটা হতে পারি নি।

আবদুল গাফফার চৌধুরী: সংক্ষিপ্ত জীবনকথা
জন্ম ১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪,বরিশাল। জাতীয়তা বাংলাদেশী, নাগরিকত্ব ব্রিটিশ। প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কার,স্বীকৃতি ও সম্মাননা: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, ইউনেস্কো পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার
সংহতি আজীবন সম্মাননা পদক (লন্ডন), মানিক মিয়া পদক, যুক্তরাজ্যের ফ্রিডম অব বারা (টাওয়ার হ্যামলেটস) উপাধি,সংহতি আয়োজিত প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সংবধর্না ইত্যাদি।

আবদুল গাফফার চৌধুরী উলানিয়া জুনিয়র মাদরাসায় ক্লাস সিক্স পর্যন্ত লেখাপড়া করে হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে বিএ অনার্স পাস করেন। ১৯৪৬ সালে পিতার মৃত্যুর পর তাকে চলে আসতে হয় বরিশাল শহরে। ভর্তি হন আসমত আলী খান ইনস্টিটিউটে। আর্থিক অনটনের শিকার হয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন। ১৯৪৭ সালে তিনি কংগ্রেস নেতা দুর্গামোহন সেন সম্পাদিত 'কংগ্রেস হিতৈষী' পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। বরিশাল শহরে তিনি কিছুদিন একটি মার্কসবাদী দল আরএসপি'র সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু। ১৯৪৯ সালে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম গল্প ছাপা হয়।
১৯৫০ সালে গাফফার চৌধুরীর কর্মজীবন পরিপূর্ণভাবে শুরু হয়। এ সময়ে তিনি 'দৈনিক ইনসাফ' পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৫১ সালে 'দৈনিক সংবাদ' প্রকাশ হলে গাফফার চৌধুরী সেখানে অনুবাদকের কাজ নেন। এরপর তিনি বহু পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের 'মাসিক সওগাত' পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন গাফফার চৌধুরী। এসময় তিনি 'মাসিক নকীব'ও সম্পাদনা করেন। একই বছর তিনি আবদুল কাদির সম্পাদিত 'দিলরুবা' পত্রিকারও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। ওই বছরই তিনি প্যারামাউন্ট প্রেসের সাহিত্য পত্রিকা 'মেঘনা'র সম্পাদক হন। ১৯৫৮ সালে আবদুল গাফফার চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক পত্রিকা 'চাবুক'এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। কিছুদিন পর সামরিক শাসন চালু হলে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি মওলানা আকরম খাঁ'র 'দৈনিক আজাদ'-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। এ সময়ে তিনি মাসিক 'মোহাম্মদীর'ও স্বল্পকালীন সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি দৈনিক 'জেহাদ'-এ বার্তা সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে তিনি সাপ্তাহিক 'সোনার বাংলা'র সম্পাদক হন। পরের বছর ১৯৬৪ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নামেন এবং অণুপম মুদ্রণ' নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। দু'বছর পরই আবার ফিরে আসেন সাংবাদিকতায়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে 'দৈনিক আওয়াজ' বের করেন। সেটা বছর দুয়েক চলেছিল। ১৯৬৭ সালে আবার তিনি 'দৈনিক আজাদ'-এ ফিরে যান সহকারী সম্পাদক হিসেবে। ১৯৬৯ সালে পত্রিকাটির মালিকানা নিয়ে সহিংস বিবাদ শুরু হলে তিনি আবার যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। ১৯৬৯ সালের পয়লা জানুয়ারি ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়া মারা গেলে তিনি আগস্ট মাসে হামিদুল হক চৌধুরীর অবজারভার গ্রুপের দৈনিক 'পূর্বদেশ'-এ যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। সেখানে মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র 'সাপ্তাহিক জয়বাংলা'য় লেখালেখি করেন। এসময় তিনি কলকাতায় 'দৈনিক আনন্দবাজার' ও 'যুগান্তর' পত্রিকায় কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর 'দৈনিক জনপদ' বের করেন।

১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে ৭২ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যান। দেশে ফেরার পর তার স্ত্রী গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতা নিয়ে যান। সেখানে সুস্থ না হওয়ায় তাকে নিয়ে ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। এরপর তার প্রবাস জীবনের ইতিহাস শুরু হয়। বিলেত যাওয়ার পর প্রথম দিকে তিনি বিভিন্ন গ্রোসারি দোকানে কাজ করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে তিনি 'বাংলার ডাক' নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। 'সাপ্তাহিক জাগরণ' পত্রিকায়ও তিনি কিছুদিন কাজ করেছেন। ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সাতজন অংশীদার নিয়ে 'নতুন দিন' পত্রিকা বের করেন। এরপর ১৯৯০ সালে 'নতুন দেশ' এবং ১৯৯১ সালে 'পূর্বদেশ' বের করেন। প্রবাসে বসে গাফফার চৌধুরী বাংলাদেশের প্রধান পত্রিকাগুলোতে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নিয়মিত লিখে গিয়েছেন। বাংলাদেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত আবদুল গাফফার চৌধুরীর রাজনীতি, সমসাময়িক ঘটনা ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে লেখা কলাম অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশে তিনি আওয়ামী লীগপন্থী কলামিস্ট হিসাবে পরিচিত এবং সমালোচিত ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ প্রচারক হিসাবে তিনি রাজনৈতিক বিষয়াবলী ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: ডানপিটে শওকত,কৃষ্ণপক্ষ, সম্রাটের ছবি,সুন্দর হে সুন্দর, চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, নাম না জানা ভোর, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ, বাংলাদেশ কথা কয় (সম্পাদনা), আমরা বাংলাদেশী নাকি বাঙালী, পলাশী থেকে ধানমণ্ডি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রের কাহিনী ইত্যাদি।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া বাংলা

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক