সিনেমা শিল্পে আমূল পরিবর্তন আসবে

সারাহ বেগম কবরীবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Oct 2016, 05:52 AM
Updated : 26 Oct 2016, 04:23 AM

শুরুতে সিনেমা প্রযোজকদের কথাই বলি। আমি যখন নিয়মিত অভিনয় করতাম তখন একেবারেই ভদ্রলোকরা সিনেমায় লগ্নি করতেন। এই প্রযোজকদের বন্ধু-গোত্রীয় কেউ কেউ তখন সিনেমাগুলো পরিচালনা করতেন, যেমন নারায়ণ ঘোষ মিতাকে দিয়ে সিনেমা বানানো হত। সে সময় পরিবেশক হিসেবে কাজ করতেন দোসানী সাহেব। তখন মূলত প্রযোজক পরিচালক ও পরিবেশকই থাকত সিনেমা নির্মাণের মূল ভূমিকায়। সে সময় আবার কয়েকজন মিলেও টাকা জোগাড় করে ছবি নির্মাণ করতেন। তখন আমরা অভিনয়শিল্পীরা এতই পেশাদারিত্ব দিয়ে কাজ করতাম যে, এটাই ছিল আমাদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। আমাদের কাজ শেষ হলে আমরা পরিচালকের কাছে থেকে সম্মানী নিয়ে চলে যেতাম। প্রযোজকের সঙ্গে অভিনয় শিল্পীদের কোনো কাজ ছিল না। পরিচালকই মূলত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।  আমাদের সময়ে যারা নিয়মিত কাজ ছবি নির্মাণ করতেন তাদের মধ্যে ফতেহ লোহানী, মহিউদ্দিন, খান আতাউর রহমান উল্লেখযোগ্য। খান আতা ভাই বেশির ভাগ দোসানী সাহেবের প্রযোজনাতেই ছবি নির্মাণ করতেন। তখন প্রযোজকরাই মূলত লগ্নি করতেন। এভাবেই আমাদের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে ওঠে।

যদিও এতদিন পড়ে আমি মনে করি, আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির মতো করে ব্যবহার হচ্ছে না। যেমন: আমাদের ইন্ডাস্ট্রি বলতে গেলে তো টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নের জন্য, ভালো ফিল্ম বানানোর জন্য। তবে আগে কয়েকবার এ পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছিল। কিছু ছবিকে ব্যাংক সাপোর্ট দিত। সে সময় ব্যাংক গ্যারান্টিও লাগত। যাই হোক, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটা গড়ে উঠেছে। । মুস্তাফিজ, এহতেশামদের মতো পরিচালকরা তখন প্রযোজক দোসানীর সঙ্গে মিলে উর্দু ছবিই বেশি নির্মাণ করতেন। তবে  বাংলা ছবিও নির্মাণ হত, তবে কম। ‘হারানো সুর’-এর মতো বাংলা ছবিও নির্মিত হয়েছে। সে সময় ফতেহ লোহানীদের মতো পরিণত বয়সের অনেক নির্মাতাই ছিলেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের সিনেমা শিল্প গড়ে ওঠে। আরেকটা বিষয়। আমাদের সময় সিনেমা মুক্তির আগে প্রচারণাটা এখনকার মতো ছিল না। তখন রিকশার পেছনে পোস্টারিং হত, ঘোড়ার গাড়িতে মাইক লাগিয়ে প্রচার চলত। আমার সময় শুধু পোস্টারিং হত। আর ছবির পোস্টার আঁকতেন আমার গুরু খ্যাতিমান নির্মাতা সুভাষ দত্ত। তখন তাঁর পেশাই ছিল এটা। রেডিওতে ইন্টারভিউ হত।

সাদাকালো থেকে ছবিগুলো যখন রঙিনভাবে নির্মিত হল, তখন আমার কাছে খুব বেশি পরিবর্তন মনে হয়নি। সাদাকালো ছবির একটা অন্যরকম আবেদন ছিল। যা রঙিন ছবিতে পাওয়া যায় না। মনে হয় রং চিক চিক করছে, মনের দুঃখবোধটাও এর মধ্য দিয়েই দেখানো হচ্ছে। তখন আর আবেদনটা মনকাড়া হয় না আমার কাছে। আর ধীরে ধীরে রঙিন ছবি চোখে সহ্য হল। তবে আমরা যেগুলোকে ‘ক্লাসিক’ ছবি বলি, এর বেশিরভাগই সাদাকালো। তারপরও এখন কালারের মধ্য দিয়ে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে, ফ্যান্টাসি এসেছে, এবং কালারের মধ্যে নানা ফিউশন এসেছে। এগুলো দেখতে ভালো লাগে। আমাদের দেশের জন্মের সময় মানুষ ছিল সাত কোটি। সবাইতো আর হলে গিয়ে ছবি দেখতে পারত না। কারণ, তখন কোনো চ্যানেল ছিল না, অনেক পরে বিটিভি আসে।

বিটিভি হওয়াতে একটা সুবিধা হয়েছিল যে, যারা সিনেমা হলে যেতে পারত না, তারা টেলিভিশনে দেখত, এভাবে দর্শক তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্মের আগে আমাদের এখানে সিনেমার দর্শক বেড়েছিল প্রচুর। কারণ, বিনোদনের একমাত্র মাধ্যমই ছিল সিনেমা। তখন রাজ্জাক-কবরী, রহমান-শবনম, উত্তম-সুচিত্রা কিংবা শাবানা, ববিতার ছবির চাহিদা ছিল বেশি। ভালো ছবি হলে ‘সিলভার জুবিলি’ হত। আমাদের সিনেমায় এই যে পরিবর্তনগুলো দেখছি, তা পাকিস্তান আমল পর্যন্তই ছিল। তখন একটা সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে এসব পরিচালিত হত। আর সে সময় গুলিস্তান সিনেমা হল ছিল পরিচালক অভিনয় শিল্পীদের জন্য আকাঙ্ক্ষিত।  আমার প্রথম ছবি  ‘সুতরাং’  এ প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয় এবং সুপার ডুপার হিট হয়। তবে আমার মনে হয় যে, সে সময় সাহিত্যের সঙ্গে, বইয়ের সঙ্গে মানুষের যে একটা সংযোগ, মেধার সঙ্গে মননশীলতা-- এসব মিলিয়েই মানুষের সিনেমা দেখার আগ্রহটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। আজকাল যেমন এতগুলো টিভি চ্যানেলের জন্য কিন্তু নতুন নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে । আগে সবাই একই সুতোয় গাঁথা ছিল। কোনো সমস্যার তৈরি হলে বন্ধুত্বের মাধ্যমেই সমাধান হত। তখন দল বেঁধে স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা সিনেমা দেখতে যেত, সেই দিনতো এখন আর নেই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম সুপার ডুপার জনপ্রিয় হয়েছিল  ‘রংবাজ’  ছবিটি। স্বাধীনতার সময় বাবা-মা, ছোট ভাইকে ফেলে আমি একরাতে এক কাপড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। পড়ে যখন ফিরে এলাম স্বাধীনতার পর, তখন কেমন যেন একটা বৈরী পরিবেশ লক্ষ্য করলাম। এফডিসির লোকজন কেমন যেন একধরনের হিংসা করতে লাগল । আমাকে নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল। এসব কারণে তখন একবার ভেবেছিলাম সিনেমা ছেড়েই দেব। এই যে ভাঙনের শুরু হল আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে, যাকে তাকে হিরোইন বানানো হত তখন।

আমাদের কিন্তু অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে এ পর্যায়ে আসতে। রিহার্সাল এবং ডায়লগ মুখস্থ করতে হয়েছে। আর লিপসিংয়ের সময় বোঝাই যেত না যে গান আসলে কে গাইছে।  আজকাল গল্পের সঙ্গে পোশাক কিংবা অনেক কিছুরই মিল নেই। এই যে সময়ের বিবর্তনে ভালো কিছু হল না, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির পচন ধরতে শুরু করল। ভালো নির্মাতা কিংবা টেকনিশিয়ানদের অনেকেই মারা গেছেন তখন। তারপর থেকে এখন এমনও ছবি হচ্ছে যে কোথাও বেড়াতে গেলে আমাকে এখনও মানুষ চিনছে, কিন্তু নতুন নায়িকাকে চিনছে না। আমরা যে শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিলাম, সেটা তো আরও মজবুত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হচ্ছে তার উল্টোটা। সিনেমার সঠিক জায়গায় সঠিক লোকটা নেই। এ জন্য সিনেমা শিল্প এগোতে পারছে না।

আর ইদানিং ‘ভারত’,  ‘ভারত’ করে যে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়েছে, সে বিষয়টায় আমিও সবসময় অবজেকশন দিই। ভারতের সঙ্গে তো আমাদের শত্রুতা নেই, আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আমরা যদি ‘ছোট ভাই’, ‘বড় ভাই’ হিসেব করে চলি তাহলে তো হবে না। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে আগে দাঁড় করাতে হবে। সিনেমা বিষয়ে আমাদের এখানে একটা স্কুল নেই, লাইব্রেরি নেই, বসে গল্প করার জায়গা নেই, সেমিনার নেই। সব সেক্টর নিয়েই সেমিনার হচ্ছে, কিন্তু সিনেমা নিয়ে কোনো সেমিনার হচ্ছে না।

২০০১ সালে আমরা আন্তর্জাতিক একটি চলচ্চিত্র উৎসব করেছিলাম ঢাকায়। এটার চেয়ারম্যান ছিলাম আমি। ১৭টি  দেশ অংশ নিয়েছিল সে উৎসবে। আজকের আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেই উৎসবে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। তাদের আমি অনুরোধ করেছিলাম , দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে তা করতে দেয়নি। পরে এ ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে তাদের লোক দিয়ে কিছু কমার্শিয়াল ছবি এনে একটা নাস্তানাবুদ অবস্থার তৈরি করে। তাহলে একটা দেশে যদি দুই ধরনের আইন চলে, দুই ধরনের কাজ চলে তাহলে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে। আজকে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমার নির্মিত  ‘আয়না’  ছবি দেখে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকও প্রশংসা করেছিলেন। অথচ আমি সরকারি অনুদানের ছবি পাই না। এর থেকে দুঃখজনক ঘটনা কী হতে পারে!

 আমিতো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ছবি বানাইনি। যাদের কোন কাজের পেশাদারিত্ব নেই, বেশির ভাগ অনুদানের ছবি তারাই পাচ্ছেন। ছবিগুলো কোথায় প্রদর্শিত হচ্ছে? এ পর্যন্ত একটা ভালো ছবিও দেখছি না। হাতেগোনা কয়েকটা ছবি শুধু ব্যতিক্রম।

এখন কেন ভারতীয় ছবি আনা হবে-- এটা সরকারের কাছে আমার প্রশ্ন ? তাই যদি হয় তাহলে আমাদের ছবি ভারতে নিতে হবে। যদি তা-ই না হয় তাহলে ভারতীয় ছবি আপাতত প্রদর্শন বন্ধ থাক। আমরা আগে ছবি বানিয়ে নিই। কিছুদিন আগে যৌথ প্রযোজনায়  ‘শঙ্খচিল’ নামে একটি ছবি নির্মিত হয়েছে বর্ডার নিয়ে। সেখানে তো ফেলানির লাশটা দেখাতে পারত তারা। এ ছবিতে পশ্চিমবঙ্গের দৃশ্যই বেশি ছিল। আমাদের অংশ ছিল সামান্যই। ফেলানির প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এখানেও আমি ছাড় দিলাম। কলকাতায় সরকারি সুবিধা নিয়ে কত সুন্দর সুন্দর ছবি নির্মিত হচ্ছে, আর আমাদের সরকার কি সুবিধা দিচ্ছে ?

আজকে জাজ মাল্টিমিডিয়া এসে সাধারণ একটা মেশিন দিয়ে প্রতিটি সিনেমা হলের দখলদারিত্ব নিয়েছে। তারা কারা ? তারা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কে, তারা কি কিছু জানে?

 টিভি চ্যানেলের কথায় আসা যাক, টিভি চ্যানেল কারা পেয়েছে, ব্যবসায়ীরা পেয়েছে। শিল্প, সংস্কৃতি তাদের হাতে চলে গেছে। তাহলে আপনারা ছবি বন্ধ করে দেন, ভারতীয় ছবি চালান। সব ইন্ডিয়ান ছবিই চলুক না, সমস্যা কোথায়? আজ এফডিসির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, সে দুর্নীতি থেকে বের হওয়ার কি কোনো মানুষ নেই? আমাদের সময়ের কয়েকজন তো আছি। আমাদের সময় থেকে সফলভাবে কাজ করে আমরা যে কজন বের হয়েছি, আমাদের কোথাও জায়গা নেই! সব জায়গায় সরকারি কর্মকর্তা। টাকাপয়সাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো তারা দেখতে পারেন, কিন্তু পলিসি মেকিংয়ের সময় আমাদের রাখুন।

যখন মুক্ত বাজার তৈরি হয় তখন বিভিন্ন ধরনের ছবি আসতেই পারে। কিন্তু এখানে হচ্ছে কী , মূলধারার সিনেমা বন্ধ হয়ে গেছে । আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি, প্রযুক্তির ব্যবহারে কথা বলছি, কিন্তু সিনেমা সেক্টরে যারা কাজ করবে তাদের না টাকা আছে, না মেধা আছে। তাহলে কী করণীয় ? অন্যদিকে সিনেমা হল মালিকরা বলছে যে, বাংলাদেশে যে ছবিগুলো তৈরি হচ্ছে , সেগুলো নাকি প্রেক্ষাগৃহে চলছে না। যার জন্য প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে ফেলছে। এর জন্য কোনো সরকারি নিয়মনীতি নেই। এ থেকে উত্তরণের জন্য একটা কমিটি দরকার। দেশীয় গল্প হোক কিংবা বিদেশি গল্প হোক--  কতগুলো ছবি আমাদের বাজারজাত করতে হবে, মানে সিনেমা হলে চলতে হবে। সিনেমা হলগুলোকে ‘সিকিউরড’ করতে হবে।

হুমায়ূন আহমেদের  ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমা যখন মুক্তি পায় তখন অনেক অনিয়মিত দর্শক ছবিটি দেখেছে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে। আমাদের দেশে বিনোদনের মূল মাধ্যম এখনও সিনেমা। তাই এ শিল্পকে শক্তিশালী করতে হলে মোটামুটি যারা ভালো কাজ করে তাদের ফান্ডিং করতে হবে।  সরকার গ্যারান্টার হয়ে ঋণ দিতে পারে। অন্যদিকে জাজ মাল্টিমিডিয়া যে প্রযুক্তি দিয়ে ছবি চালায়, এটা প্রত্যেক সিনেমা হল মালিকরা নিজেরাই কিন্তু লাগাতে পারত। এ প্রযুক্তির ব্যবহার সিনেমা হলে সরকারের বাধ্যতামুলক করে দেওয়া দরকার ছিল। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত  ‘আয়নাবাজি’ ছবিটিকে সাধুবাদ জানাই। এই ছবিটি ভালো লেগেছে। গল্প, উপস্থাপনা খুব ভালো হয়েছে। এ রকম ভিন্ন ভিন্ন গল্পের ও রুচির ছবি যখন আসবে তখন ১০ বছর নয়, পাঁচ বছরের মধ্যেই আমাদের সিনেমা শিল্পে আমূল পরিবর্তন আসবে।

অনুলিখন: সোহেল আহসান

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক