সাংবাদিক প্রবীরের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা

ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশ আটকের কয়েক ঘণ্টা পর ফরিদপুরে তথ্য প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা হয়েছে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে।

নিজস্ব প্রতিবেদকও ফরিদপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 August 2015, 08:04 PM
Updated : 17 August 2015, 02:15 PM

ফেইসবুকে লেখার মাধ্যমে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সুনাম ক্ষুণ্ণের অভিযোগ তুলে রোববার রাত ১১টার দিকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করা হয়েছে।

মামলার বাদী ফরিদপুরের এপিপি স্বপন পাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জীবনহানির আশঙ্কা প্রকাশ করে তার জন্য মন্ত্রীকে দায়ী করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন প্রবীর সিকদার। এভাবে তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে মন্ত্রীর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।     

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই খন্দকার মোশাররফ ফরিদপুরের সংসদ সদস্য।  

ফেইসবুকে গত কিছু দিন ধরে লেখালেখির পর হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়েছিলেন প্রবীর সিকদার। কিন্তু পুলিশ তা নেয়নি জানিয়ে ফেইসবুকে তা নিয়েও লিখেছিলেন তিনি।

গত ১০ অগাস্ট ‘আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামের একটি স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন- “আমি খুব স্পষ্ট করেই বলছি, নিচের ব্যক্তিবর্গ আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন : ১. এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি, ২. রাজাকার নুলা মুসা ওরফে ড. মুসা বিন শমসের, ৩. ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এই তিন জনের অনুসারী-সহযোগীরা।”

ওই লেখার কারণেই তাকে রোববার সন্ধ্যায় গোয়েন্দা পুলিশ তাদের কার্যালয়ে ধরে নেয়। তবে তখন তাকে আটক না করার কথাই বলেছিল পুলিশ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) সাজ্জাদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “প্রবীর সিকদারকে কোনো কারণে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।

“তিনি তার জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছেন এবং পুলিশ তাকে সহায়তা করছে না এমন একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ডেকে আনা হয়েছে। পুলিশ তার কাছে জানতে চাইছে, কী কারণে তার জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর ইন্দিরা রোডের কার্যালয় থেকে প্রবীরকে গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে তার ছেলে সুপ্রিয় সিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান।

সুপ্রিয় বলেন, “প্রথমে একটি নীল রঙের পুলিশ ভ্যানে তাকে তোলা হয়েছিল। এরপর খামারবাড়ি এলাকায় ভ্যান থামিয়ে তাকে ধূসর রঙের একটি প্রাইভেটকারে তুলে গোয়েন্দা পুলিশের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়।”

বাবাকে তুলে নেওয়ার পর মোটর সাইকেলে পিছু নিয়েছিলেন সুপ্রিয়।

রাতে প্রবীরের মোবাইল থেকে ফোন পেয়ে ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন তার ছোট ভাই, স্ত্রী ও দুই ছেলে।

সুপ্রিয় বলেন, “ডিবির এক এডিসি আমাকে বলেছেন, বাবাকে রাতে এখানে থাকতে হবে। কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘আমার হাত-পা বাঁধা’।”

এরপর মধ্যরাতে ডিবির একটি মাইক্রোবাসে করে বের করে আনা হয় প্রবীর সিকদারকে। তখন তার ছেলে সুপ্রিয় সিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার বাবার বিরুদ্ধে ফরিদপুরে মামলা হয়েছে বলে তারা জেনেছেন। তার বাবাকে ফরিদপুর নেওয়া হচ্ছে।       

২০১৪ সালে বেইজিংয়ে প্রবীর সিকদার। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে তিনি চীনে গিয়েছিলেন।

প্রবীর সিকদার ২০০১ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুর প্রতিনিধি থাকার সময় সন্ত্রাসীর হামলায় গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন।

তার অভিযোগ, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লেখার কারণে মুসার ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা ওই হামলা চালায়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তাধীন মুসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই ও আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বেয়াই (ছেলের শ্বশুর)।

একাত্তরে শহীদের সন্তান প্রবীর সিকদার বর্তমানে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ এবং দৈনিক বাংলা ৭১ নামের পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। তিনি এর আগে সমকাল ও কালের কণ্ঠে কাজ করেছিলেন।

সম্প্রতি অনলাইন সংবাদপত্র বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত এক লেখায় মুসা বিন শমসেরকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তুলনা করা হয়। এ নিয়ে নিজের ফেইসবুক পাতায় সমালোচনায় মুখর হন প্রবীর। এরপর তিনি জনকণ্ঠে প্রকাশিত মুসাকে নিয়ে তার লেখা তুলতে থাকেন।

গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও মুসাকে নিয়ে ‘জেনে নিন কে এই 'প্রিন্স ড. মুসা বিন শমসের'!’ লেখাটি নিজের ফেইসবুক পাতায় তোলেন প্রবীর, সেই সঙ্গে লেখেন-  “যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ছে ! রেহাই নেই কারও !”

দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সেই রাজাকার’ কলামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুসা বিন শমসেরের বিতর্কিত ভূমিকার বিবরণ তুলে ধরেছিলেন সাংবাদিক প্রবীর সিকদার, যার পরিবারের ১৪ জন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

তখন হামলার পর মামলায় মুসাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানিয়েছিলেন প্রবীর, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

এরপর ঢাকায় চলে আসেন প্রবীর সিকদার। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে চীনেও গিয়েছিলেন তিনি।